স্থায়ী ক্যাম্পাসে মালিকদের অনীহা শিক্ষার বদলে ব্যবসা অগ্রাধিকার

বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে সঙ্কটের ছায়া

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

শিক্ষার্থী ধরে রাখতে কিংবা নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার দৌড় অনেক আগে থেকেই। তবে ইদানীং এই প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে ঘনবসতি এবং শিক্ষার্থী প্রাপ্যতাকে কেন্দ্র করে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে শিক্ষা সেক্টরের ব্যবসার সব মধু যেন শিক্ষার্থীদের ঘিরেই। ফলে যে যেখানে পারছে সেখানেই বাসাবাড়ি কিংবা খুপড়ি ঘরেও ক্যাম্পাস খুলে বসে আছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার তাগিদ এমনকি কঠোর বার্তা দেয়া হলেও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে চায় না মালিকপক্ষ। তাদের কাছে যেন শিক্ষার চেয়ে ব্যবসাই বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সূত্র বলছে দেশের ১১৬টি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ২৩ বিশ^বিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়েছে। এখনো বাকি ৯৩টি বিশ^বিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। তারা আদালতের মাধ্যমে সময় বাড়িয়ে কিংবা অজুুহাত দেখিয়ে নিজেদের সুবিধামতো অস্থায়ী ক্যাম্পাসেই একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

অবশ্য এর আগে একাধিকবার দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ জমির ওপর স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বাধ্যবাধকতা থাকলেও দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনো ভাড়া করা ভবনেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে এসব বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এর পেছনের নানা কারণ ও স্বার্থের চিত্র।

সূত্র মতে দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বারবার সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ পেয়েও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে আগ্রহ দেখায়নি। বিশেষ করে স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়ার অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক সুবিধা। রাজধানীর বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থান করলে শিক্ষার্থী আকর্ষণ সহজ হয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় মনে করে, ঢাকার বাইরে বা শহরতলিতে চলে গেলে ভর্তি কমে যেতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেই কোনো রাখঢাক না রেখেই তাদের আশঙ্কার কথা প্রকাশও করেছে। এর মধ্যে অনেক নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ও শিক্ষার্থী হারানোর আশঙ্কায় রাজধানীর বাইরে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে চায় না। যদিও উচ্চশিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন অনেক উদ্যোক্তার কাছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা শিক্ষা উন্নয়নের চেয়ে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। জমি ক্রয়, ভবন নির্মাণ, ল্যাব ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে শত শত কোটি টাকা প্রয়োজন। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান ভাড়া ভবনে কার্যক্রম চালিয়েই লাভজনক অবস্থান ধরে রাখতে চায়।

সম্প্রতি ইউজিসি স্থায়ী ক্যাম্পাসের তথ্য নিয়ে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে মাত্র ২২টি বিশ^বিদ্যালয়ের নাম পাওয়া গেছে। পরে অবশ্য সেখানে আরো একটি বিশ^বিদ্যালয় সেখানে যুক্ত হয়েছে। স্থায়ী ক্যাম্পাসের তালিকায় থাকা ২২ বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চট্টগ্রাম, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেজ এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিলস ইউনিভার্সিটি, সিটি ইউনিভার্সিটি, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, অতীশ দীপকঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, ইস্ট ডেলটা ইউনিভার্সিটি, বরেন্দ্র ইউনিভার্সিটি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, খাজা ইউনূস আলী বিশ^বিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, কাদিরাবাদ সেনানিবাস।

ইউজিসির নথি অনুযায়ী, বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে শোকজ, ভর্তি নিষেধাজ্ঞা এবং নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি আট থেকে ১০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউজিসি, কারণ তারা দীর্ঘ সময়েও স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে ব্যর্থ হয়েছে। সূত্র আরো জানায়, স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার অগ্রগতি যাচাই করতে কিছু দিন আগে ইউজিসি ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ পরিদর্শন দল পাঠিয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠানের কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় দাবি করেছে, বিগত ২০২০ সালে থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত করোনা মহামারী, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং জমিসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ সম্পন্ন করতে পারেনি। এ কারণ দেখিয়ে অন্তত ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় অতিরিক্ত সময় চেয়েছিল। সেই সময়ও অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। ইউজিসি সূত্র বলছে, স্থায়ী ক্যাম্পাস ছাড়া মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। নিজস্ব ল্যাব, গবেষণা সুবিধা, খেলার মাঠ, গ্রন্থাগার ও শিক্ষার্থীসেবা কেন্দ্র গড়ে তুলতে স্থায়ী অবকাঠামোর বিকল্প নেই। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সম্প্রতি স্থায়ী ক্যাম্পাসবিহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে আরো কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পরিচালক (বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় বিভাগ) প্রফেসর ড. সুলতান মাহ্মুদ ভূঁইয়া নয়া দিগন্তকে জানান, যেসব প্রতিষ্ঠান স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর হয়েছে তাদের সাধুবাদ জানাই। আর যারা এখনো নানা অজুুহাতে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর হননি তাদের বিরুদ্ধে শিগগিরই একটি ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করব। আমাদের ইউজিসির নিজস্ব আইন ও বিধির আলোকেই আমরা অধিকাংশ বিশ^বিদ্যালয়ের মালিক পক্ষকে সময় দিয়েছি। এখন এর বাইরে আর সময় দেয়ার সুযোগ হয়তো দেয়া যাবে না। ফলে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যারা যেতে পারেননি আবার সময়ও শেষ হয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প আমাদের হাতে নেই। সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চশিক্ষাকে ব্যবসায়িক মুনাফার বাইরে এনে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে আইন বাস্তবায়নে কঠোরতা প্রয়োজন। অন্যথায় বছরের পর বছর সময় বাড়িয়েও স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের লক্ষ্য পূরণ হবে না, আর শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।