মো: সাজ্জাতুল ইসলাম, ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে এক ভয়াবহ জালিয়াতি, অনিয়ম ও নিয়োগ বাণিজ্যের চিত্র উঠে এসেছে। শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এই ঘটনায় দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির মোট ৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনই ভুয়া সনদে নিয়োগপ্রাপ্ত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পায়।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কলেজ শাখার ৬১ জন শিক্ষকই সম্পূর্ণ ভুয়া সনদের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন। অন্যদিকে স্কুল শাখার ১৫ জন শিক্ষকের মধ্যে ১২ জনের সনদও জাল বলে প্রমাণ মিলেছে। অর্থাৎ, পুরো প্রতিষ্ঠানে প্রকৃত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের সংখ্যা হাতে গোনা মাত্র তিন জন।
পরিবারকেন্দ্রিক নিয়োগ সিন্ডিকেট: তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক নিজেই এই জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের স্ত্রী, ছেলে, পুত্রবধূ, মেয়ে, বোন, বোনের জামাইসহ নিকট আত্মীয়দের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিগত গাড়িচালককেও শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘুষ বাণিজ্য ও বেতন আত্মসাৎ: ডিআইএ’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়ার পাশাপাশি তাদের বেতন-ভাতার একটি অংশ নিয়মিতভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি কোষাগার থেকে কোটি টাকা লোপাট: তদন্তে আরও জানা গেছে, ভুয়া শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নাম সরকারি তালিকায় না থাকলেও ২০২২ সালে হঠাৎ করেই তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে মোট ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে কলেজ শাখা ৪ কোটি ২১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা, স্কুল শাখা ১ কোটি ৩৬ লাখ ২২ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়। এই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
অধ্যক্ষের সনদও জাল: সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো অভিযুক্ত অধ্যক্ষ ইমদাদুল হকের নিজের শিক্ষাগত সনদও ভুয়া বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচাই করে তার সনদের সত্যতা পাওয়া যায়নি। এছাড়া তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন, দেশে ওই নামে কোনো অনুমোদিত বিশ্ববিদ্যালয় নেই বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক। তার দাবি, তদন্তটি একপেশে এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত। পরিবারের সদস্যরা নিজ যোগ্যতায় নিয়োগ পেয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।
ডিআইএ’র পরিচালক অধ্যাপক সহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এ ঘটনায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মই নয়, বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার তদারকি, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন ভয়াবহ অনিয়ম কীভাবে অগোচরে রয়ে গেল- তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের জালিয়াতি দেশের শিক্ষা খাতকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলবে।



