তদন্তে ধোঁয়াশা : পেট্রোবাংলাও যেন অন্ধকারে

এলএনজি টার্মিনাল বিপর্যয়ে তীব্র গ্যাস সঙ্কট, বিপাকে জনজীবন ও শিল্প

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের জ্বালানি খাত আবারো বড় ধরনের সঙ্কটের মুখে পড়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) আগুন লাগা ও কারিগরি ত্রুটির ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানাতে পারেনি পেট্রোবাংলা। একই সাথে কবে নাগাদ টার্মিনালটি পুরোপুরি মেরামত করে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা যাবে, সে বিষয়েও কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেনি সংস্থাটি। ফলে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাস সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না, সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি, শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়েছে।

গতকাল শনিবার পেট্রোবাংলা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামতে দেশী-বিদেশী কারিগরি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। যত দ্রুত সম্ভব টার্মিনালটি চালুর চেষ্টা চলছে। তবে কী ধরনের ত্রুটি হয়েছে, আগুনের কারণ কী, কতটা ক্ষতি হয়েছে কিংবা কখন গ্যাস সরবরাহ আবার শুরু হবে- এসব বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সংস্থাটি শুধু জানিয়েছে, নতুন কোনো অগ্রগতি হলে পরে জানানো হবে এবং সাময়িক অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নীরবতা উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনায় বড় ধরনের কারিগরি সমস্যা দেখা দিলেও কেন বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তারা মনে করছেন, স্বচ্ছতার স্বার্থে দুর্ঘটনার কারণ, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা এবং সম্ভাব্য পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা দ্রুত জনসমক্ষে তুলে ধরা উচিত।

প্রতিদিন ৪৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস কম

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। এর ফলে মোট সরবরাহ প্রায় দুই হাজার ৬২০ এমএমসিএফডি থেকে নেমে প্রায় দুই হাজার ১৭০ এমএমসিএফডিতে দাঁড়িয়েছে। অথচ দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় তিন হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান আরো বেড়ে গেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৯৭ কোটি এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়, যা মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩৭ শতাংশ। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থ পুরো গ্যাস ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হওয়া।

বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নগর এলাকার আবাসিক গ্রাহকরা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিনে মোটেই গ্যাসের চাপ থাকে না। অনেক এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চুলা জ্বালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পরিবারগুলোকে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অথবা বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা আবার বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে। রান্না না হওয়ায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি

গ্যাস সঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। অনেক স্টেশন নির্ধারিত সময়ের আগেই গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়ায় সেবা বন্ধ করে দিচ্ছে।

ঢাকায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের অন্যতম প্রধান পরিবহন সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। গ্যাস সঙ্কটের কারণে এসব যানবাহনের চলাচলও কমে গেছে। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি চালকদের আয়ও কমে যাচ্ছে।

শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ

গ্যাস সঙ্কটের কারণে শিল্প-কারখানাগুলো উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সাথে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানাগুলোর জন্যও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে শিল্পোৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি রফতানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেলে লোডশেডিং বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

তদন্তে ধোঁয়াশা

এর আগে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রকৌশলীরা প্রাথমিকভাবে ত্রুটির কারণ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হন। পরে বিদেশী বিশেষজ্ঞ দল টার্মিনাল পরিদর্শন করে। তবে এখন পর্যন্ত অপারেটর প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি শুধু ‘কারিগরি ত্রুটি’র কথা জানিয়েছে। কী ধরনের যান্ত্রিক বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অপারেটর প্রতিষ্ঠানের। পেট্রোবাংলা বিষয়টি তদারকি করলেও কারিগরি তদন্তের বিস্তারিত তথ্য তাদের কাছেও দেয়া হয়নি।

একক নির্ভরতার ঝুঁকি

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়া প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় বিকল্প সক্ষমতা এখনো দুর্বল। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু সেই আমদানি ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত ব্যাকআপ না থাকায় একটি টার্মিনালের ত্রুটিই জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, বিকল্প সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান এলএনজি টার্মিনালগুলোর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

গ্যাস সরবরাহ এখনো অনিশ্চিত

চট্টগ্রামে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সারকারখানা বন্ধ, পাম্পে চাপ কম

বিশেষ সংবাদদাতা, চট্টগ্রাম জানায়, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে গ্যাসের সরবরাহ কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে তা নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র অবশ্য কমপক্ষে ১০ দিন পর্যন্ত লাগতে পারে বলে একটি ধারণা দিয়েছেন। মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালের একটি অগ্নিকাণ্ডে বিকল হওয়ার ফলে এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে গ্যাসের লাইনে চাপ না থাকায় গ্যাসনির্ভর সব ক্ষেত্রে বিশৃংখল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এক দিকে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে, অন্য দিকে শিল্প কারখানায় উৎপাদন কমছে। রান্নার চুলায়ও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। সিএনজিচালিত যানবাহনগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সীমিত পরিমাণ গ্যাস নিয়ে পাম্প থেকে ফিরতে হচ্ছে। চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোটাই এলএনজিনির্ভর হওয়াতে চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টরে এই সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ৪ শ’ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে দেয়া হচ্ছে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস। সূত্র বলছে সারা দেশে ৩ হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে গত বৃহস্পতিবার ২ হাজার ২১১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জোগান মিলেছে। এর মধ্যে আবার এলএনজির একটি টার্মিনাল থেকে জোগান এসেছে ৫৬১ মিলিয়ন ঘনফুট। যদিও এলএনজির জোগান হওয়ার কথা ১১শ’ মিলিয়ন ঘনফুট। গত মঙ্গলবার মহেশখালিতে ভাসমান দু’টি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। সামিটের অপর টার্মিনালটিতে থেকে এখন এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে। ফলে গ্যাস সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এ দিকে সবচেয়ে সঙ্কটে পড়েছে চট্টগ্রামের সরবরাহ ব্যবস্থা। রাজধানীসহ অন্যান্য স্থানে বিভিন্ন গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয়। কিন্তু এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে আমদানিকৃত গ্যাসের উপরই নির্ভরশীল চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টর। সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪ শ’ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু এক্সিলারেটের টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামে সরবরাহ কমিয়ে ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট দেয়া হচ্ছে। ঢাকার দিকে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানো হলে চট্টগ্রামের সরবরাহ আরো কমে যাবে বলে সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে।

এ দিকে গ্যাস সঙ্কটে বন্ধ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা সিইউএফএল, রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিকলবাহাসহ বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ দেয়া হয়েছে মাত্র ৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট। এ ছাড়া সারকারখানায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে বহুজাতিক কাফকোকে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হলেও রাষ্ট্রায়ত্ত সিইউএফএল বন্ধ রাখা হয়েছে।

গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানাসহ সবগুলো খাত বেকায়দায় পড়েছে। টেক্সটাইল কারখানাগুলো বেশ ভুগছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় গতকাল ছুটির দিনেও প্রতিটি রিফুয়েলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। হাসান নামের এক সিএনজি চালক বলেন, দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ৮০ টাকার গ্যাস দিয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় রান্নাঘরের চুলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

এলএনজি আমদানিসহ যাবতীয় ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) চট্টগ্রামস্থ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রতিমন্ত্রীর কল ঢোকায় আর কথা বলতে পারেননি। তবে আরপিজিসিএলের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, এ ধরনের এক্সপেরিয়েন্স একেবারেই নতুন। একটি বয়লার চালু করে সচল করার একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, কিন্তু তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। তিনি জানান, টার্মিনালটি সচল হতে আরো কমপক্ষে ১০ দিন লেগে যেতে পারে।