বিতর্ক শুদ্ধতার দুয়ার খোলে

বাংলাদেশে সংবিধান ও জুলাই সনদ ঘিরে যে বিতর্ক চলছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক মতপার্থক্য নয়। একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক অধিকার এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় আলোচনার অংশ। গণতান্ত্রিক সমাজে এসব প্রশ্নে দ্বিমত হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই মতপার্থক্য হওয়া উচিত, সংলাপ, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া যা আইনের শাসন ও জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। যদি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমঝোতার পথে অগ্রসর হয়; তবে বর্তমান সঙ্কট রাষ্ট্রসংস্কার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী করার সুযোগ হতে পারে

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আলোচনা-সমালোচনা যুক্তিতর্ক যত বেশি হবে; গণতন্ত্রের ভিত ঠিক তত মজবুত হবে। এমন তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে শুদ্ধতার রুদ্ধ দুয়ার খোলা সহজ হবে; যা ইতঃপূর্বে বন্ধ ছিল। গণতান্ত্রিক সমাজে গঠনমূলক তর্ক-বিতর্কের সর্বোৎকৃষ্ট ফোরাম জাতীয় সংসদ। যত উত্তাপ-উত্তেজনা, সেখানে আছড়ে পড়ুক একবার না বহুবার। এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই- বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের অবসানের পর এখন দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। রাষ্ট্রে মৌলিক কাঠামো, সংবিধানের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন ঘিরে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সাথে যুক্ত হয়েছে প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে মতভেদ। রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান সংসদে যুক্তিতর্ক-বিতকর্, একই সাথে রাজপথে মিছিল-সমাবেশ, জনসভা। এসব নিয়ে নাগরিক সমাজের নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া এখন বিদ্যমান। ফলে রাজনৈতিক পরিবেশ এক দিকে যেমন নতুন উত্তাপ; অন্য দিকে কেউ একে সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন বলে মনে করেন। বুদ্ধিদীপ্ত সমাজ-সচেতন ব্যক্তিবর্গ মনে করেন, ধীরলয়ে চলতে হবে সব পক্ষকে। এই জটিল সময়ে সুন্দর একটা পথনকশার জন্য পক্ষ-বিপক্ষ সব পক্ষকে পূর্বাপর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় সুচিন্তিতভাবে হাতে-হাত রেখে চলতে হবে। সে চলাই হবে সবচেয়ে উত্তম। জাতির এই সন্ধিক্ষণে দেবে আর নেবে এই চেতনা স্মরণে রেখে অগ্রসর হতে হবে।

কোনো কোনো মহল আবার এও মনে করেন, দুই দফায় লীগের প্রায় দুই দশকের শাসনামলে রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে ‘জং’ ধরেছিল; তা ঘষা-মাজা নিয়ে রাজনীতিতে এখন যত তাপ-উত্তাপ-উত্তেজনা। এই ঘষা-মাজা কোন প্রকৃতিতে, কিভাবে এবং কতটুকু করতে হবে? দেশ জাতির জন্য যতটুকু অপরিহার্য এই মুহূর্তে ঠিক ততটুকু করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যাতে জনগণের চাওয়া স্বৈরশাসনের অবসান শুধু একমাত্র চাওয়া নয়, আবার যেন কোনো জগদ্দল পাথর ফিরতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। দুইপক্ষের মতান্তরে শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ শুধু বাড়বে না, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রে জমে থাকা ‘জং’গুলো, ধীরে ধীরে গোটা যন্ত্রকে বিকল করে দিতে পারে। জুলাইয়ের সব অর্জন মুহূর্তে ধুলায় মিশে যেতে পারে। এমন অপদমন, জাতিকে শুধু হতোদ্যম করবে না। নাগরিকরা তাদের আত্মত্যাগের হিসাবও চাইবেন। কোনো ব্যত্যয় ঘটলে পক্ষ-বিপক্ষ সবাইকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। ইতিহাস কখনো কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। যেমন শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়াকে ইতিহাস অনাদিকালের জন্য স্থান করে দিয়েছে কোটি মানুষের মণিকোঠায়। এ জন্য এই যুগলের ইতিহাস থেকে আমাদের পাঠ নিতে হবে।

জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একসময় লাইনচ্যুত বাংলাদেশকে মজবুত সড়কে তুলতে ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়েছিল। তখন এসব দফা চমৎকার এক ব্যবস্থাপত্র ছিল। রাষ্ট্রনায়ক শহীদ জিয়া সে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে অগ্রসর হতে না হতে মোজাফফর গং জিয়া অধ্যায়ের যবনিকাপাত ঘটায়। বেগম জিয়ারও সময় ভালো কাটেনি। ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, একদিনও তাকে স্বস্তিতে থাকতে দেয়া হবে না। ২০২৩ সালে বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা কর্মসূচি দিয়েছিল। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রায় সব দল মিলেমিশে রাষ্ট্রকে তার অবয়বে ফিরিয়ে নিতে একটি ঐতিহাসিক সনদে স্বাক্ষর করেছে। যুক্তি বলে, সবাই যেখানে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সেটা গ্রহণ করেছে; এখন সেখান থেকে বিচ্যুৎ হওয়ার অবকাশ নেই। এই সনদ এখন ব্যক্তি বা দল নয়, গোটা জাতির সম্পদ। এর সুফল সবার ভাগে যোগ হবে। বিএনপি এখন মোটা দাগে সনদ থেকে সরে দাঁড়াতে চাচ্ছে বলে অনেকে মনে করলেও হাইকমান্ড জনারণ্যে স্পষ্ট করেছেন; জুলাই সনদকে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করা হবে। আশাহতদের জন্য এটা দারুণ এক বার্তা। তারপরও বিএনপির এ কোণ সে কোণ থেকে জুলাই সনদ নিয়ে যেসব বাক্য বচন চলছে, তাতে দলের সংহতি নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে অনেকে। যে দল ভোটে প্রমাণ করেছে, দেশে তারাই সবচেয়ে জনপ্রিয়।

বিএনপির ৩১ দফায় যে মোদ্দাকথাগুলো আছে; সংক্ষেপ করলে এমনটা দাঁড়ায়- রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিমূলক সরকার, একটি দলীয় রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা, আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কারভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, সংসদীয় সংস্কার ইত্যাদি। অন্য দিকে জুলাই সনদে সংবিধান, নির্বাচন, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার বহু রাজনৈতিক দলের আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি সংস্কার দলিল। সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জাতীয় সমঝোতার দলিল। ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদি।

১৯ ও ৩১ দফা প্রকৃতপক্ষে বিএনপির দলীয় দর্শনের প্রতিফলন। যাতে রয়েছে নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক সংস্কার, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ। বিএনপির ৩১ দফা ও জুলাই সনদের মিলগুলো হচ্ছে- গণতন্ত্র ও নির্বাচন। উভয় ক্ষেত্রে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। দুই প্রস্তাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।

বিএনপির ৩১ দফায় যেমন রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, তেমনি জুলাই সনদেও প্রশাসন, দুর্নীতি দমন, নির্বাচন কাঠামো, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের বিষয় আছে। বিএনপির ৩১ দফা হচ্ছে, দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক প্রস্তাব। দলীয় নীতির ভিত্তিতে তৈরি। আর জুলাই সনদ বিএনপিসহ একাধিক রাজনৈতিক দল ও ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার ফল। জুলাই জাতীয় সমঝোতার এক অমূল্য দলিল, সংবিধান পরিবর্তনের মাত্রা। ৩১ দফা সংবিধান সংশোধনের কথা বলে, তবে বিএনপির রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে। আর জুলাই সনদ সংবিধানের বিভিন্ন অংশে সংস্কারের জন্য বেশি কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখে। কিছু বিষয় সংবিধান সংশোধনের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। জুলাই সনদে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে আছে সংসদের কাঠামো পরিবর্তন, ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমারেখা টানা। ৩১ দফাতেও ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয় আছে। তবে জুলাই সনদে এসব নিয়ে বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয়েছে। বিএনপির ৩১ দফা বাস্তবায়ন হলে, দলটির রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার হবে। দলীয় নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে কাজ করবে। অন্য দিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে, এটি শুধু একটি দলের নয়, বরং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ আর বিএনপির রাষ্ট্র সংস্কারে প্রণীত ৩১ দফার মধ্যে মোটাদাগে বিতর্কের জায়গাগুলো হলো- সংবিধানের ওপর জুলাই সনদের অবস্থান। এটি কি রাজনৈতিক সমঝোতা থাকবে, নাকি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পাবে। এটি বাস্তবায়ন কিভাবে হবে? তাকি সংসদের মাধ্যমে, গণভোটের মাধ্যমে, নাকি বিশেষ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য কতটা পরিবর্তিত হবে, এ বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। সহজ ভাষায় বলা যায়, ১৯ দফা, বিএনপির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও উন্নয়ন দর্শন। ৩১ দফা, বিএনপির আধুনিক রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা। আর জুলাই সনদ গণ-অভ্যুত্থানের পর জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব। সবচেয়ে বড় ব্যবধান হলো, ৩১ দফা একটি দলের প্রস্তাব। আর জুলাই সনদ একটি বহুপক্ষীয় জাতীয় সংস্কারকাঠামো হিসেবে তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে সংবিধান ও জুলাই সনদ ঘিরে যে বিতর্ক চলছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক মতপার্থক্য নয়। একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক অধিকার এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় আলোচনার অংশ। গণতান্ত্রিক সমাজে এসব প্রশ্নে দ্বিমত হওয়া স্বাভাবিক। তবে সেই মতপার্থক্য হওয়া উচিত সংলাপ, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, যা আইনের শাসন ও জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। যদি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমঝোতার পথে অগ্রসর হয়; তবে বর্তমান সঙ্কট রাষ্ট্রসংস্কার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরো শক্তিশালী করার সুযোগ হতে পারে। বিপরীতে যদি সঙ্ঘাত, অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি পায়, এর প্রভাব শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। অর্থনীতি, প্রশাসন, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। সে জন্য দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের স্বার্থে শান্তিপূর্ণ এবং সাংবিধানিক সংলাপ সব থেকে বেশি প্রয়োজন। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণ ঘটানো গেলে ইতিহাস সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে স্মরণে রাখবে।

লেখক : সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]