আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো: সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু)। সাংবিধানিক আইন অনুযায়ী পাঁচ বছরের মেয়াদের হিসাব ধরে ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তার এই সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত থাকার কথা ছিল। তবে তার নিয়োগের সূচনালগ্ন থেকেই দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের ঝড় ওঠে।
বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন, ২০০৪’। আইনটির ৯ ধারা অনুযায়ী, কমিশনের কোনো চেয়ারম্যান বা কমিশনার পরবর্তীতে প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের জন্য যোগ্য হবেন না। যেহেতু মো: সাহাবুদ্দিন ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুদক কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাই দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজ্ঞ এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অভিযোগ তোলে যে, তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন ও নির্বাচিত করার মাধ্যমে সরাসরি সুনির্দিষ্ট আইনি বিধানকে তোয়াক্কা করা হয়নি।
তবে এই আইনি বিতর্কের মেঘ কাটতে না কাটতেই দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটে যায় এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন। দায়িত্ব নেয়ার মাত্র ১৬ মাসের মাথায় ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। সরকার পরিবর্তনের পরপরই মো: সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি পদে বহাল থাকা নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন ওঠে। রাজনৈতিক অঙ্গনে তার সম্ভাব্য পদত্যাগ এবং ‘সেইফ এক্সিট’ (নিরাপদ প্রস্থান) নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন ও আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠন করার পর এ আলোচনা নতুন মাত্রায় পৌঁছায়। তবে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার স্বার্থে নতুন সরকার শুরুতে তাকে অপসারণের কোনো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকে।
দুদক কমিশনার হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির ছায়া : সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মো: সাহাবুদ্দিন যখন ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুদক কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন, তখন থেকেই সংস্থাটির নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে একাধিক প্রশ্ন ওঠে। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল-তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আমলাদের দুর্নীতির ফাইল চাপা দেয়া, গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান ও তদন্তকে নিজস্ব ক্ষমতাবলে প্রভাবিত করা এবং প্রকৃত অপরাধীদের অনৈতিকভাবে দায়মুক্তি বা ‘ক্লিনচিট’ দেয়া।
মো: সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়াবহ ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগটি উঠে আসে খাদ্য অধিদফতরের একটি নিয়োগ দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে। ২০১৩ সালে খাদ্য অধিদফতরে ৪৪ জন পরিদর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে ভয়াবহ জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়। পরীক্ষার নম্বরপত্র কারচুপি করে অনুত্তীর্ণ প্রার্থীদের অর্থের বিনিময়ে উত্তীর্ণ দেখানো হয়, ফলে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরা তাদের প্রাপ্য চাকরি থেকে বঞ্চিত হন। তদন্তে অনিয়মের সত্যতা মেলায় ২০১৪ সালের ৭ অক্টোবর দুদক শাহবাগ থানায় একটি মামলা করে।
কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়, মামলার পর আসল অপরাধীদের আড়াল করতে শুরু হয় এক বিশাল দর-কষাকষি। ভুয়া উপায়ে চাকরি পাওয়া ব্যক্তি এবং খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চার্জশিট (অভিযোগপত্র) থেকে মুক্ত করতে দুদকের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে প্রায় ৮০ লাখ টাকা ঘুষ দেয়া হয়। পরবর্তীতে ফাঁস হওয়া টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ড এবং তদন্ত নথির বিবরণ থেকে জানা যায়, এই ঘুষের অর্থ থেকে তৎকালীন কমিশনার মো: সাহাবুদ্দিনের হাতে পৌঁছেছিল ৩০ লাখ টাকা।
প্রাপ্ত তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, পাবনা জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল রহিম লালের মধ্যস্থতায় এই ঘুষের টাকা সাহাবুদ্দিনের দুদক কার্যালয়ে পৌঁছানো হয়। তিনি নিজ কক্ষে বসেই এই অর্থ নিয়েছিলেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এর বিনিময়ে সাহাবুদ্দিন তদন্ত কর্মকর্তাদের ওপর প্রবল মানসিক চাপ সৃষ্টি করেন, যাতে নিয়োগ দুর্নীতির সুবিধাভোগীদের চাকরি বহাল রাখা হয় এবং তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়।
মামলার মূল তদন্তকারী কর্মকর্তা পরবর্তীতে প্রকাশ করেন যে, অবৈধভাবে চাকরি পাওয়া ব্যক্তিদের বহিষ্কারের সুপারিশ করা হলে সাহাবুদ্দিন তীব্র আপত্তি তোলেন এবং লিখিত প্রমাণের অভাব দেখিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন ও প্রতিবেদন পুনর্বিন্যাসের নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে এ সংক্রান্ত একটি ফাঁস হওয়া অডিও সিডি দুদকের হাতে আসলেও সাহাবুদ্দিনের প্রভাবেই তা এক কর্মকর্তার ড্রয়ারে দুই বছর ফেলে রাখা হয়। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে তদন্ত ঝুলিয়ে রাখার পর, অবশেষে প্রভাবশালীদের বাদ দিয়ে কেবল সীমিত কয়েকজন সদস্যকে আসামি করে দায়সারা চার্জশিট দাখিল করা হয়।
পদোন্নতি বাণিজ্য মেগা দুর্নীতি ধামাচাপা ও স্বজনপ্রীতি : শুধু বাহ্যিক মামলা বা তদন্তই নয়, দুদকের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন পরিচালনাতেও মো: সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে পদোন্নতি বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির সময় জ্যেষ্ঠতা ও মেধার তোয়াক্কা না করে অর্থ দাবি করার একাধিক ঘটনা ঘটে। পদোন্নতি তালিকার শীর্ষে থাকা একজন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, তার নাম তালিকায় প্রথম থাকা সত্ত্বেও সাহাবুদ্দিনের পক্ষে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার কাছে প্রথমে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। পরবর্তীতে তা কমিয়ে তিন লাখ টাকা করা হলেও নীতিগত কারণে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে সম্পূর্ণ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন এই কমিশনারের হস্তক্ষেপে তার পদোন্নতি আটকে দেয়া হয়। রাষ্ট্রীয় বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্ত নস্যাৎ করার ক্ষেত্রেও মো: সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা অত্যন্ত বিতর্কিত।
পদ্মা সেতু প্রকল্প : পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারির তদন্তে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১২ সালে দুদক প্রাথমিক মামলা দায়ের করলেও ২০১৪ সালে বিশ্বব্যাংককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মামলাটির চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সাহাবুদ্দিন একাধিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, বিশ্বব্যাংকের রাজনৈতিক চাপে এই মামলা করা হয়েছিল এবং বাস্তবে কোনো অনিয়ম ঘটেনি। তবে সমালোচকদের মতে, স্বাধীন তদন্ত না করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তি বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গকে ক্লিনচিট দেয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দুদকের পরবর্তী চেয়ারম্যান দায়িত্ব নিয়ে জানান, পদ্মা সেতু প্রকল্পে অনিয়মের প্রাথমিক তথ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন কমিশনার সাহাবুদ্দিনসহ শীর্ষ পর্ষদ তদন্তটি নস্যাৎ করেছিলেন।
বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি : ২০১৫ সালে বেসিক ব্যাংকের প্রায় ২,০৩৭ কোটি টাকা হরিলুটের ঘটনায় দুদক ৫৬টি মামলা করলেও ব্যাংকটির মূল কারিগর ও তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু এবং পরিচালনা পর্ষদের কাউকেই আসামি করা হয়নি। অথচ ঋণের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিল এই পর্ষদই। অভিযোগ রয়েছে, সাহাবুদ্দিনের সরাসরি হস্তক্ষেপে বাচ্চু ও তার প্রভাবশালী সহযোগীদের রক্ষা করা হয়। প্রায় আট বছর পর ২০২৩ সালে যখন চার্জশিট দাখিল করা হয়, তখন সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তারা আদালতে স্বীকার করেন যে, তৎকালীন কমিশনারদের চরম রাজনৈতিক চাপ ও বাধার কারণে মূল আসামিদের আগে চার্জশিটভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তা ছাড়া, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার পেছনেও সাহাবুদ্দিনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট প্রতিফলন ছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
এস আলম গ্রুপের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও ব্যাংক খাতে ভূমিকা : দুদকের দায়িত্ব শেষ করার পর মো: সাহাবুদ্দিনের করপোরেট কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ার নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ২০১৭ সালে যখন বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ‘এস আলম গ্রুপ’ জোর করে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তখন সাহাবুদ্দিনকে ব্যাংকটির স্বতন্ত্র পরিচালক ও পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে বসানো হয়। একই সাথে তিনি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকেরও উপদেষ্টা হিসেবে আর্থিক সুবিধাদি নেন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি এই পদগুলোতে বহাল ছিলেন।
সাহাবুদ্দিনের এই মেয়াদকালেই ইসলামী ব্যাংকের সুশাসন ও করপোরেট কাঠামো সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। ভুয়া ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে শত শত কোটি টাকা ঋণ বিতরণ, নিয়ম বহির্ভূতভাবে মূলধন পাচার এবং এস আলম গ্রুপের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েমে পর্ষদের সদস্য হিসেবে তিনি নীরব সমর্থন জুগিয়েছেন বলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি। বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল তাকে ‘এস আলম গ্রুপের প্রতিনিধি’ হিসেবেও প্রকাশ্যে আখ্যায়িত করেছিল।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক ব্যর্থতা ও বিতর্কিত ভূমিকা : রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেয়ার পর মো: সাহাবুদ্দিনের প্রতিটি পদক্ষেপ দেশকে এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটের দিকে ঠেলে দেয়।
একতরফা নির্বাচনকে বৈধতা দান : ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির একতরফা, প্রধান বিরোধী দলবিহীন এবং ভোটারহীন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে তিনি বিনাবাক্যে সাংবিধানিক অনুমোদন দেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে একটি নিরপেক্ষ অভিভাবকত্ব প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে তিনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নেই সচেষ্ট ছিলেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নীরবতা : ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি, গণগ্রেফতার ও শত শত মানুষকে হত্যা করা হচ্ছিল, তখন দেশের সর্বোচ্চ অভিভাবক ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে সাহাবুদ্দিন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৪ জুলাই আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদল স্মারকলিপি নিয়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করলেও তিনি ছাত্রদের দাবির পক্ষে বা হিংস্রতা বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি।
শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে বিভ্রান্তি : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর, রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতেই সেনাপ্রধান ও রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই দিন রাতে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন নিজেই শেখ হাসিনার পদত্যাগের কথা নিশ্চিত করেন। অথচ এর কয়েক মাস পর এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি সম্পূর্ণ বিপরীত বক্তব্য দিয়ে দাবি করেন, শেখ হাসিনার কোনো লিখিত পদত্যাগপত্র তার কাছে নেই।” তার এই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিতর্কিত বক্তব্যের ফলে দেশে ভয়াবহ সাংবিধানিক বিভ্রান্তি ও সরকার পতনের বৈধতা নিয়ে নতুন আইনি বিতর্কের জন্ম হয়।
বিদেশে সম্পদ : মো: সাহাবুদ্দিনের অনিয়ম কেবল দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা সূত্রে উঠে আসে তার বিদেশে বিপুল অঙ্কের অবৈধ সম্পত্তি ও সেকেন্ড হোমের তথ্য।
মালয়েশিয়া : মালয়েশিয়ার ‘মাই সেকেন্ড হোম’ (গগ২ঐ) কর্মসূচির আওতায় তিনি অন্তত দেড় লাখ মালয়েশিয়ান রিংগিত বিনিয়োগ করে রেসিডেন্সি সুবিধা নিয়েছিলেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই) : দুবাইয়ের একাধিক ব্যাংকে তার বিপুল গোপন অর্থ জমা রাখা এবং ‘ওয়ারাদ জেনারেল ট্রেডিং এলএলসি’ নামক একটি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের প্রমাণ মিলেছে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব : এ ছাড়া তার কাছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রেসিডেন্সি ভিসা ও বিকল্প পাসপোর্ট রয়েছে বলেও বিভিন্ন মহলে গুরুতর তথ্য প্রকাশ পায়, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার সাংবিধানিক যোগ্যতাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
মো: সাহাবুদ্দিনের কর্মজীবন, বিচার বিভাগ থেকে দুদক, ব্যাংক খাত এবং সর্বশেষে রাষ্ট্রপতির পদ- প্রতিটি ধাপে আইনি শিথিলতা, দুর্নীতির প্রশ্রয় ও দলীয় আনুগত্যের এক চরম নজির স্থাপন করেছে। বিচারক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, ব্যাংক লুটপাটে সহযোগিতা এবং সর্বশেষ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে একটি রক্তক্ষয়ী আন্দোলন চলাকালে দায়িত্বহীন ভূমিকা তাকে দেশের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। তার এই পুরো অধ্যায়টি নির্দেশ করে কিভাবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে ধ্বংস করা হয়েছিল।
বিদায়ী রাষ্ট্রপতিকে গ্রেফতারের দাবি, আইন কী বলে?
রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন সরে দাঁড়ানোর পর তাকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইনকিলাব মঞ্চ।
তবে পদত্যাগের পর সংবাদমাধ্যমের সাথে কথোপকথনে এ ধরনের দাবি উড়িয়ে দিয়ে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের কথা সামনে এনেছেন সাহাবুদ্দিন।
সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দুই ধরনের সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। প্রথমত, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করা বা না করা কোনো কাজের জন্য তাকে আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের বা চালু রাখা এবং তাকে গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য পরোয়ানা জারি করা যাবে না।
সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় কার্যভারকালীন দ্বিতীয় সুরক্ষা তার ক্ষেত্রে আর প্রযোজ্য হবে না। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করা কাজের দায়মুক্তি পদত্যাগের পরও বহাল থাকে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান।
তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের অংশ নয়, এমন কোনো কাজ, দুর্নীতি কিংবা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো ফৌজদারি অপরাধ এই দায়মুক্তির আওতায় পড়বে না।
সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বা সেই বিবেচনায় কোনো কাজ করলে কিংবা না করলে সেজন্য তাকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। তবে ওই কাজের কারণে সরকারের বিরুদ্ধে আইনি কার্যধারা নেয়ার অধিকার বহাল থাকবে।
এই সুরক্ষাকে রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালের মধ্যে সীমিত করা হয়নি।
অন্য দিকে ৫১(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তার বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের বা চালু রাখা এবং তাকে গ্রেফতার বা কারাবাসের জন্য পরোয়ানা জারিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কৃতকার্যের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যায় না। এই দায়মুক্তি পদত্যাগের পরও কার্যকর থাকবে। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভূমিকার জন্য মো: সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাবে না।
তবে সব ধরনের কাজে দায়মুক্তি দেয় না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদের দায়িত্বের অংশ নয় এমন কোনো কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি থাকবে না। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে কোনো ফৌজদারি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট থাকলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চলতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রপতিকে গ্রেফতারের দাবির বিষয়ে এই আইনজীবী বলেন, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ কোনো সুনির্দিষ্ট আমলযোগ্য ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে মামলা দায়ের না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রেফতার করার কোনো সুযোগ নাই। আমরা সেরকম কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কাউকে তুলতে শুনিনি।



