প্রস্তুতি থাকলেও নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয়ে রাজনৈতিক দলগুলো

স্থানীয় সরকার নির্বাচন

হারুন ইসলাম
Printed Edition

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের মনোযোগ এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। তবে তৃণমূলের এ নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ হবে এবং সব দলের জন্য সমান সুযোগ থাকবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সংশয় রয়ে গেছে। সরকারপক্ষ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করার কথা বললেও বিরোধী দলগুলো বলছে- পরিবেশ আগে, নির্বাচন পরে।

জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা স্থানীয় নির্বাচনের প্রতি দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। বিরোধী দলগুলোর আশঙ্কা, প্রশাসনের প্রভাবমুক্ত পরিবেশ তৈরি না হলে স্থানীয় পর্যায়েও জাতীয় নির্বাচনের মতো একই চিত্র দেখা যেতে পারে। ফলে বর্তমানে সরাসরি নির্বাচন বর্জনের কথা না বললেও, তারা সতর্ক অবস্থান ও পর্যবেক্ষণ করছে।

বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকেরা অবশ্য বলছেন, দেশে এখন একটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, যা স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের জন্য সহায়ক।

এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে। আমরা চাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সে ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক।

অন্য দিকে, বিরোধী দলগুলোর দাবি প্রশাসনকে পুরোপুরি নিরপেক্ষ করতে হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী প্রেক্ষাপট ও ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াতে ইসলামীর আমির সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচন শুধু ভোটের দিনের বিষয় নয়, পুরো প্রক্রিয়াটাই সুষ্ঠু হতে হবে। জায়গায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হবে না।

দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রশাসন নিরপেক্ষ না হলে কোনো নির্বাচনই বিশ্বাসযোগ্য হবে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে প্রশ্নমুক্ত করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে এবং মাঠপর্যায়ে দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন ও ছোট দলগুলো এ নির্বাচনকে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন বিস্তারের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। তবে বড় দলগুলোর প্রশাসনিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের শঙ্কা তাদেরও রয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলের চিফ হুইফ নাহিদ ইসলাম বলেন, জাতীয় নির্বাচন একটি পরিবর্তনের সূচনা করেছে, কিন্তু সেই পরিবর্তন কতটা বাস্তব হবে, তা বোঝা যাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। আমরা চাই এটি সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতামূলক হোক।

দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁঁইয়া বলেন, তরুণ নেতৃত্ব ও নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য সমান সুযোগ তৈরি না হলে নির্বাচন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে।

একইভাবে আস্থার পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন এবি পার্টির নেতারাও। দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, শুধু নির্বাচন আয়োজন করলেই হবে না, সেটা বিশ্বাসযোগ্য করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের পর এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার পরিবেশ তৈরি করা।

যুগ্ম সদস্য সচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ মনে করেন, ‘সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হবে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট নতুন নয়, তবে জাতীয় নির্বাচনের পর এটা আরো গভীর হয়েছে। এ আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা দৃশ্যমান করা এবং নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। অন্যথায় নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হলেও তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

এ দিকে মাঠপর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই ও ভোটারের সাথে যোগাযোগের প্রস্তুতি শুরু করেছে। তবে চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণা না হওয়া এবং পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে এ প্রস্তুতি চলছে বেশ সতর্কতার সাথে। এখন সবার চোখ নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পদক্ষেপের দিকে, তারা আস্থার এ সঙ্কট কাটিয়ে কতটা গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন উপহার দিতে পারে।