ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সুরক্ষিত?

ডাটা প্রাইভেসি আইন

কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্পষ্ট সম্মতি নিতে হবে। একই সাথে সেই তথ্য কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে, তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কার্যকর ডাটা প্রাইভেসি আইন মূলত তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে: সম্মতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। তবে বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ব্যবহারকারী বিভিন্ন অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্যবহারের সময় শর্তাবলি না পড়েই ‘সম্মতি’ দিয়ে দেন। এতে অজান্তেই ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের আইনগত অনুমতি চলে যায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে।

শাহ আলম নূর
Printed Edition

ডিজিটাল প্রযুক্তির অভাবনীয় প্রসারের ফলে ব্যক্তিগত তথ্য বা ‘ডাটা’ এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অনলাইন শিক্ষা এবং সরকারি ডিজিটাল সেবার ব্যাপক বিস্তৃতিতে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে জমা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত ‘ডাটা প্রাইভেসি আইন’ নাগরিকের তথ্যের নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত করতে পারবে- সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি এবং মোবাইল সিম ব্যবহারকারী প্রায় ১৫ কোটির কাছাকাছি। প্রতিদিন এই বিশাল জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লগইন করছেন। এর ফলে তাদের নাম, ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), বর্তমান অবস্থান (লোকেশন) এবং আর্থিক লেনদেনের মতো সংবেদনশীল তথ্য বিভিন্ন সার্ভারে সংরক্ষিত হচ্ছে।

ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের উদ্যোগ

নাগরিকের তথ্যের অপব্যবহার, তথ্য ফাঁস এবং অননুমোদিত ব্যবহার রোধে সরকার ‘ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন’ (ডাটা প্রটেকশন অ্যাক্ট) প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এই আইনের খসড়া অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির স্পষ্ট সম্মতি নিতে হবে। একই সাথে সেই তথ্য কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে, তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি কার্যকর ডাটা প্রাইভেসি আইন মূলত তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে: সম্মতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। তবে বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ব্যবহারকারী বিভিন্ন অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্যবহারের সময় শর্তাবলি (ঞবৎসং ধহফ ঈড়হফরঃরড়হং) না পড়েই ‘সম্মতি’ দিয়ে দেন। এতে অজান্তেই ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের আইনগত অনুমতি চলে যায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও আর্থিক জরিমানা

বিশ্বজুড়ে ডাটা লঙ্ঘনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সার্ভার থেকে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁস হয়েছে। তথ্যের এই নিরাপত্তাহীনতা রোধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অত্যন্ত কঠোর ‘জেনারেল ডাটা প্রটেকশন রেগুলেশন’ (জিডিপিআর) কার্যকর করেছে।

দেখা গেছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তথ্য সুরক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় বেশ কিছু বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে শত শত মিলিয়ন ইউরো জরিমানা গুনতে হয়েছে। জিডিপিআর প্রবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত কোম্পানিগুলোর ওপর বিলিয়ন ইউরোর বেশি জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের খসড়া আইনেও তথ্য সুরক্ষায় ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ ও সক্ষমতার ঘাটতি

আইন প্রণয়ন করা হলেও এর কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বর্তমান অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো ব্যক্তিগত তথ্য। কিন্তু আমাদের দেশে ডাটা সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং জনসচেতনতার অভাব রয়েছে।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, আইন যদি অতিরিক্ত কঠোর হয় তবে তা উদীয়মান ডিজিটাল ব্যবসা ও স্টার্টআপ খাতের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারকারীর আস্থা অর্জনে শক্তিশালী ডাটা সুরক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।

মানবাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি

মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ডাটা প্রাইভেসি আইনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা। তাদের দাবি, এই আইন এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে রাষ্ট্রীয় সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা বিদেশী কোম্পানি- সবাই যেন একই মানদণ্ডে জবাবদিহির আওতায় আসে। বর্তমানে ব্যাংকিং, টেলিকম ও ই-কমার্স খাতে আলাদা আলাদা ডাটা ব্যবস্থাপনা নীতি থাকলেও একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামোর অভাব রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি ‘স্বাধীন ডাটা সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ’ গঠন করা হলে এই সমন্বয়হীনতা দূর করা সম্ভব।

আর্থিক খাতের ঝুঁকি

আর্থিক খাতে ডাটা সুরক্ষার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েক হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, এই বিশাল লেনদেনের নিরাপত্তা সামান্য বিঘিœত হলেও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির অন্যতম শর্ত হলো শক্তিশালী ডাটা সুরক্ষা আইন। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারেন।

সচেতনতা ও ভবিষ্যৎ পথ নকশা

সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ডাটা সুরক্ষা নিয়ে সচেতনতা এখনো প্রান্তিক পর্যায়ে। অনেকেই জানেন না যে তাদের ব্রাউজিং হিস্ট্রি, লোকেশন বা ভয়েস ডাটা বিভিন্ন কোম্পানি বিশ্লেষণ করে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে। এই তথ্যের অপব্যবহারের মাধ্যমে পরিচয় চুরি এবং সাইবার প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘ডাটা মিনিমাইজেশন’ (ন্যূনতম তথ্য সংগ্রহ) নীতি জনপ্রিয় হচ্ছে। পাশাপাশি এনক্রিপশন প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক সাইবার সিকিউরিটি ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে।

উপসংহার

ডাটা প্রাইভেসি আইন শুধু একটি আইনি দলিল নয়, এটি দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের মেরুদণ্ড। শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, দক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ব্যাপক জনসচেতনতা। ডিজিটাল যুগে ডাটা এখন কেবল তথ্য নয়, এটি ক্ষমতার উৎস এবং অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই সম্পদ কতটা নিরাপদ থাকবে, তার ওপরই নির্ভর করছে ২০৪১ সালের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর স্থিতিশীলতা ও নাগরিক আস্থা।