নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর স্কুলছাত্রী রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় বিচারের দাবিতে বিক্ষুব্ধ ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষ। শিশু রামিসার হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় এলাকাবাসী বলছেন, রামিসা আমাদের হৃদয়ে আজীবন থেকে যাবে। যতক্ষণ অপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর না হচ্ছে আমরা বিচার চেয়ে যাবো। কেননা বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই বারবার এমন নৃশংস ঘটনা ঘটছে। গতকাল শুক্রবারও রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী, বায়তুল মোকাররমসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও অপরাধীর ফাঁসির দাবিতে সভা-সমাবেশ হয়। এতে অংশ নেয় বিভিন্ন সংগঠন ও নানান শ্রেণী পেশার লোকজন।
আন্দোলনকারীরা বলছেন, সারা দেশের মানুষ হতবাক, মানুষ এত নিষ্ঠুর অমানবিক হয় কী করে। আমরা তার প্রকাশ্যে ফাঁসি চাই, যাতে এ ধরনের কাজ কেউ কখনো করতে সাহস না পায়। বিচারহীনতার কারণে এমন ঘটনা বারবার ঘটছে। দু-একদিন এটি নিয়ে কথা উঠবে। এরপর সবাই যখন চুপ, তখন আসামির জামিন হয়ে যায়। মেয়েটা আমাদের হৃদয়জুড়ে থাকবে। আর ঘাতকের ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত আমাদের দাবি চলতে থাকবে। সাত দিন নয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। দেশে বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা বারবার ঘটছে।
এদিকে গতকাল শুক্রবার সকালে মেয়ের কুলখানির জন্য গ্রামের বাড়ি থমুন্সীগঞ্জে গেছেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লাসহ পুরো পরিবার। যাওয়ার আগে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বড় ভাই হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমার এখানে এসেছিলেন। আমাকে বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন।
অন্যদিকে গতকাল সকালে পল্লবী থানার সামনেও বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। সেখানে তারা রামিসা হত্যার বিচার দাবিতে পুলিশের কাছে স্মারকলিপি দেন এবং দ্রুত তদন্ত শেষ করার আহ্বান জানান। পুলিশ ঘটনাটির তদন্ত দ্রুত এগিয়ে নেয়ার আশ্বাস দেয়।
ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, শিশু রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা আগেও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। তার অতীত কর্মকাণ্ড ভালো ছিল না। রামিসা হত্যাকাণ্ডে দায়েরকৃত মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালতে জমা দেয়া হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রামিসাদের বাসা থেকে বের হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আশ্বস্ত করেছি, পুলিশ ডিপার্টমেন্ট দ্রুততার সাথে আসামিকে গ্রেফতার করেছে। আসামি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। এখন চার্জশিট দেয়ার পালা। চার্জশিট দেয়ার আগে ডিএনএ টেস্টটা করতে হবে। ডিএনএ টেস্টের জন্য সিআইডি ল্যাবে অলরেডি আদালতের অনুমতি নিয়ে চেষ্টা চলছে। ডিএনএ টেস্টের নিয়ম হলো ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে, যেহেতু এটা বৈজ্ঞানিক বিষয়। সেটা শেষ হবে রোববারের দুপুরের মধ্যে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ওই দিনের মধ্যে আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে পারব এবং তারপর অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে বিচারকার্য নিষ্পন্ন হয় সে চেষ্টা করব। যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য আমাদের পক্ষ থেকে চেষ্টা থাকবে।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার সকালে মিরপুর-১১ নম্বরের বি ব্লকের একটি ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসা আক্তারের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটিকে ধর্ষণ শেষে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যার পর লাশ গুম করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের ভেতর থেকেই দেহের অংশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পুলিশ পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে (২৬) গ্রেফতার করেছে।
ঢাকার পল্লবীতে স্কুলশিক্ষার্থী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে গণবিক্ষোভ, মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে জুমার নামাজ শেষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ছাত্রসংগঠন এবং সাধারণ ছাত্র-জনতা এই কর্মসূচি পালন করেন। এসব বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে বক্তারা শিশু রামিসাসহ দেশব্যাপী সব নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান। একই সাথে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, আশঙ্কাজনক হারে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজি বৃদ্ধির প্রতিবাদে ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানানো হয়। প্রতিবেদকদের পাঠানো বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেয়া হলো।
সিলেটে ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ
সিলেট ব্যুরোর পাঠানো খবর অনুসারে, রামিসা হত্যাকাণ্ড, দেশব্যাপী চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির প্রতিবাদে বাদ জুমা নগরীতে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করেছে সিলেট মহানগর ছাত্রশিবির। মিছিলটি কোর্টপয়েন্ট থেকে শুরু হয়ে প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে চৌহাট্টা পয়েন্টে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। মহানগর সভাপতি শহীদুল ইসলাম সাজুর সভাপতিত্বে এবং প্রশিক্ষণ সম্পাদক কলিম উদ্দিনের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তারা বলেন, ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরও দেশে এমন জঘন্য হত্যাকাণ্ড ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ছাত্রসমাজ কখনো প্রত্যাশা করেনি।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরও বর্তমান সরকার শান্তিশৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যর্থ হয়ে পতিত ফ্যাসিস্টদের মতো দখলদারি ও চঁাঁদাবাজির পথেই হাঁটছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে আইনি ফাঁকফোকর দেখাচ্ছেন। নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে রামিসা হত্যার বিচার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ভিসি নিয়োগের মাধ্যমে সিট বাণিজ্য ও নোংরা রাজনীতি বন্ধের দাবি জানান। অন্যথায় ছাত্রসমাজকে সাথে নিয়ে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দেয়া হয়। সমাবেশে জেলা পশ্চিমের সভাপতি আবু জুবায়ের ও শাবিপ্রবির সেক্রেটারি মুজাহিদুল ইসলামসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
খুলনায় ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ মিছিল
খুলনা ব্যুরো জানিয়েছেন, শিশু রামিসা হত্যার বিচার এবং দেশব্যাপী সন্ত্রাস নৈরাজ্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের খুলনা মহানগর শাখা। জুমার নামাজ শেষে মিছিলটি নিউ মার্কেট বায়তুন নূর মসজিদ চত্বর থেকে শুরু হয়ে ময়লাপোতা মোড়ে গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। মহানগর সভাপতি রাকিব হাসানের সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক হাফেজ ইউসুফ ইসলাহী। মহানগর সেক্রেটারি ইসরাফিল হোসেনের পরিচালনায় এতে সাবেক সভাপতি জাহিদুর রহমান নাঈমসহ নগর শাখার বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা দেশের আইনশৃঙ্খলার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে এনে অপরাধীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করার দাবি জানান।
কুড়িগ্রামের উলিপুরে মানববন্ধন
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার প্রতিবাদে এবং দেশে ক্রমবর্ধমান শিশু নির্যাতন ও নারী হত্যার বিচারের দাবিতে কুড়িগ্রামের উলিপুরে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুপুরে উলিপুর পৌর শহরের মসজিদুল হুদা মোড়ে ‘সচেতন শিক্ষার্থী সমাজ’-এর ব্যানারে এই কর্মসূচি পালিত হয়। মানববন্ধনে বিশিষ্ট সংগঠক মতলেবুর রহমান মঞ্জু ও সাবেক ছাত্রদল নেতা আবু জাফর সোহেল রানা বলেন, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে, যা শিশুদের নিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। বক্তারা রামিসার পাশাপাশি আগে ঘটে যাওয়া তনু, নুসরাত, আছিয়া ও মুনিয়া হত্যারও দ্রুত ও সঠিক বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান।
চট্টগ্রামের মিরসরাই ও চন্দনাইশে বিক্ষোভ
মিরসরাই ও চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি জানায়, চট্টগ্রামে পৃথক দু’টি স্থানে শিশু রামিসা হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মিরসরাইয়ে বাদ জুমা মডেল মসজিদ এলাকা থেকে ‘মিরসরাই ছাত্র-জনতা’র উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে পৌর সদরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে শেষ হয়। আয়োজক শাহীন চৌধুরী ও মো: শাফায়েতের সঞ্চালনায় সমাবেশে স্থানীয় আলেম, যুবক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অপর দিকে চন্দনাইশের বাগিচাহাটে ‘সেবা সামাজিক সংগঠন চন্দনাইশ’-এর ব্যানারে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে স্থানীয় মুসল্লি, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করেন। উভয় সমাবেশ থেকেই নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরো কঠোর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।
জয়পুরহাটের কালাইয়ে মানববন্ধন ও মিছিল
কালাই (জয়পুরহাট) সংবাদদাতার পাঠানো তথ্য অনুসারে, রামিসা আক্তার হত্যার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে জয়পুরহাটের কালাইয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জুমার নামাজের পর কালাই সাংবাদিক পরিষদ ও আন-নাজাত ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে কালাই পৌর শহরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিল শেষে বাসস্ট্যান্ড চত্বরে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন- সহকারী অধ্যাপক মাওলানা সেলিম রেজা, অধ্যক্ষ ফিতা মিয়া, অধ্যক্ষ শাহজাহান আলী, বিএনপি নেতা আব্দুল আলিম এবং সাংবাদিক মুনছুর রহমান। বক্তারা দেশের আইন ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার তাগিদ দেন।



