সাউথ চায়না মর্নিং
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, বর্তমান বিশ্ব শান্তিময় পরিস্থিতিতে নেই। আধিপত্যবাদ আজ বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে ‘ল অব দ্য জাঙ্গল’ বা ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতে ফিরিয়ে নেয়ার বিপজ্জনক প্রতিযোগিতার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বুধবার বেইজিংয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সাথে বৈঠকের সময় চীনের নেতা এসব কথা বলেন। বিশ্বজুড়ে অশান্ত পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে শি বলেন, চীন ও রাশিয়ার আন্তর্জাতিক সমন্বয় বা সহযোগিতা আরো জোরদার করা উচিত। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফরের সময় ‘থুসিডিডিজ ট্র্যাপ’-এর কথা উল্লেখ করেছিলেন শি। প্রশ্ন তোলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কি তথাকথিত থুসিডিডিজ ট্র্যাপ এড়িয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে?’ পরে নিজেই উল্লেখ করেন, এর উত্তর দুই নেতাকেই নির্ধারণ করতে হবে।
থুসিডিডিজ ট্র্যাপ বলতে, উদীয়মান শক্তি যখন কোনো ক্ষমতাসীন শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে তখন যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হওয়াকে বোঝায়।
পুতিনের সাথে বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, বড় দেশ হিসেবে চীন ও রাশিয়াকে অবশ্যই নিজেদের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে। তাদের উচিত জাতিসঙ্ঘের কর্তৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখা। একইসাথে যেকোনো একতরফা বলপ্রয়োগের চেষ্টা রুখে দেয়া উচিত।
চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ওয়াশিংটনের বলপ্রয়োগ নীতির সমালোচনা হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যখন ইরানে হামলা শুরু করে তখনও একতরফা বলপ্রয়োগের অভিযোগ তোলা হয়। যুদ্ধবিরতির পর রাশিয়া জানায়, তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ‘একতরফা বলপ্রয়োগ’ শোচনীয় পরাজয়ের মুখে পড়েছে। আর চীন সামরিক পদক্ষেপের নিন্দা জানায়।
পুতিনের সাথে বৈঠকের সময় শি জিনপিং সামরিকীকরণের চেষ্টার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলকে অস্বীকার করার যেকোনো পদক্ষেপ কিংবা সামরিকীকরণের যে চেষ্টা চলছে, রাশিয়া ও চীনের উচিত সেটিরও বিরোধিতা করা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির কাছে অক্ষশক্তির (জার্মানি, ইতালি ও জাপান) পরাজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে দুই পক্ষের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। চীন মিত্রশক্তির পক্ষে ছিল। বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলেও ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তা কিছুটা শিথিল করা হয়েছে।
রাশিয়া-চীন সম্পর্ক অভূতপূর্ব উচ্চতায় : পুতিন
বিবিসি জানায়, চীনে সফররত রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বলেছেন, রাশিয়া-চীন সম্পর্ক এখন অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছেছে। অন্য দিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, চীন ও রাশিয়া একে অপরের কৌশলগত শক্তি হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়া উভয় দেশ উচ্চতম পর্যায়ের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরো শক্তিশালী করবে। বুধবার বেইজিংয়ে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠকের পর তারা এ কথা বলেন।
বেইজিংয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে শি জিনপিং এবং ভøাদিমির পুতিন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও কৌশলগত সহযোগিতা আরো গভীর করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বৈঠকের আগে বেইজিংয়ে পুতিনকে স্বাগত জানান শি জিনপিং। রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, বৈঠক শুরুর আগে বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল’-এর বাইরে দুই নেতা করমর্দন করেন। রুশ নেতাকে স্বাগত জানাতে গ্রেট হলের প্রবেশপথে লালগালিচা বিছানো হয়।
স্থানীয় সময় বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে গ্রেট হলে এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ের আগেই বৈঠক শুরু হয়। সংক্ষিপ্ত এই বৈঠক প্রায় ১৫ মিনিট ধরে চলে। বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি, মেধাস্বত্ব এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাসহ বিভিন্ন খাতে ২০টিরও বেশি চুক্তি সই করা হয়। এই চুক্তিগুলোর মাধ্যমে দুই দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতা আরো বিস্তারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। একই সাথে একটি যৌথ ঘোষণায় ‘বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা’ গঠনের পক্ষে অবস্থান নেয় দুই দেশ।
বৈঠক শেষে দুই নেতা কোনো সাংবাদিকের প্রশ্ন নেননি এবং সরাসরি স্থান ত্যাগ করেন। তবে উভয় পক্ষই আশা প্রকাশ করে যে, এই চুক্তি ও আলোচনা চীন-রাশিয়া সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে। চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠক করতে গত মঙ্গলবার বেইজিং পৌঁছেন ভøাদিমির পুতিন। সেখানে দুই নেতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সমস্যা নিয়ে মতবিনিময় হওয়ার কথা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফরের কয়েকদিনের মাথায় পুতিন ও শির এই বৈঠককে গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন-রাশিয়ার সম্পর্ক যে এখনো অটুট তা তুলে ধরাই এই সফরের মূল লক্ষ্য হতে পারে।
ক্রেমলিনের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, পুতিন ও শি জিনপিং রাশিয়া-চীনের কৌশলগত অংশীদারত্বকে কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করবেন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সম্পর্ক গভীর হয়েছে। এরপর থেকে পুতিন নিয়মিত বেইজিং সফর করছেন।
২০ চুক্তিতে স্বাক্ষর চীন-রাশিয়ার
জ্বালানি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো জোরদারের বিষয়ে সম্মত হয়েছেন চীনের নেতা শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বুধবার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর এই দুই নেতা অন্তত ২০টি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। পুতিনের সফরের শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে ৪০টি চুক্তি স্বাক্ষর হবে। তবে বুধবার ২০টিতে স্বাক্ষরের কথা জানিয়েছে ক্রেমলিন। বাকিগুলো পরে পৃথকভাবে ঘোষণা করা হবে।



