ডিজেল-সার সঙ্কট ও শিলাবৃষ্টির আঘাত

ঘাটাইলে কৃষকের স্বপ্নে হতাশার হাতছানি

Printed Edition
পাম্পে ডিজেলের জন্য কৃষকদের দীর্ঘলাইন  : নয়া দিগন্ত
পাম্পে ডিজেলের জন্য কৃষকদের দীর্ঘলাইন : নয়া দিগন্ত

খাদেমুল ইসলাম মামুন ঘাটাইল (টাঙ্গাইল)

চলমান বোরো মৌসুমে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় কৃষকের মুখে স্বস্তির বদলে উদ্বেগই বেশি। এক দিকে বোরো আবাদের পরপরই ছিল ডিজেল সঙ্কট, অন্য দিকে সারের অপ্রতুলতা ও সাম্প্রতিক শিলাবৃষ্টির ক্ষতি- এসব মিলিয়ে কৃষকের স্বপ্নে ভর করেছে অনিশ্চয়তার ছায়া। মাঠে ধান পাকার মৌসুম হলেও উৎপাদন ঘিরে তাদের মনে হতাশা বাড়ছে দিন দিন।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, আধুনিক কৃষিকাজ এখন পুরোপুরি যন্ত্রনির্ভর হয়ে উঠেছে। সেচের শ্যালো মেশিন, জমি চাষে পাওয়ার টিলার, ধান কাটায় হারভেস্টার ও কীটনাশক প্রয়োগে স্প্রে মেশিন- সবকিছুর চালিকাশক্তি এখন ডিজেল। কিন্তু তেলের সঙ্কটে কৃষকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হয়েছে। এর মধ্যে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বেড়ে ১১৫ টাকা হওয়ায় খরচও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

গত শুক্রবার সাগরদীঘি তমা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, শতাধিক কৃষক দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছেন ডিজেলের জন্য। লক্ষিন্দর ইউনিয়নের দোলালিয়া গ্রামের কৃষক ইমান আলী জানান, তিনি ১০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। সকাল সাতটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও দুপুর পর্যন্ত তেল পাননি। তার প্রয়োজন ২০ লিটার ডিজেল, কিন্তু তাকে দেয়া হচ্ছে মাত্র পাঁচ লিটার। এতে সময় ও উৎপাদন দুই দিকেই ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তিনি।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। ওই ফিলিং স্টেশনে দায়িত্বরত ট্যাগ অফিসার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আহমেদ রেজা বলেন, বাস্তবে ডিজেলের কোনো সঙ্কট নেই। কিছু মানুষের অতিরিক্ত মজুতের প্রবণতার কারণে সাময়িক কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, যা দ্রুত সমাধান হবে।

এ দিকে ধলাপাড়া ইউনিয়নের কৃষকেরা শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। চাপড়া বিল, পদ্ম বিল ও কালিয়ান বিল এলাকায় শত শত বিঘা জমির ধান মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। কৃষক বুলবুল, শহিদুল ও সেন্টু মিয়া বলেন, অর্ধেকের বেশি ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সেন্টু মিয়া জানান, এ বছর ধান কাটতে হবে মূলত খড়ের জন্য। লাভ তো দূরের কথা, মূলধন ফেরত পাওয়াও অনিশ্চিত। তিনি আরো বলেন, বাজারে ধানের দাম ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা হলেও একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি এক হাজার টাকার বেশি। পানিতে জোঁকের ভয় থাকলে মজুরি আরো বাড়ে, ফলে উৎপাদন খরচ সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

সারের সঙ্কট নিয়েও রয়েছে কৃষকদের অভিযোগ। সাগরদীঘি ইউনিয়নের শোলাকুড়া গ্রামের কৃষক ইদ্রিস আলী লিটন বলেন, পাহাড়ি কৃষি এলাকায় সারের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। একজন বিসিআইসি ডিলার যে পরিমাণ সার পান, তা একজন কৃষকের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।

উপজেলার বড় কৃষক তোফাজ্জল হোসেন জানান, তিনি প্রায় ২০০ একর জমিতে কলা, পেঁপে, বেগুন ও শসার আবাদ করেছেন। এসব ফসলের জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর বিপুল পরিমাণ সার প্রয়োজন হয়, যা বর্তমান সরবরাহে মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সার ডিলার বলেন, গত এপ্রিল মাসে তিনি যে পরিমাণ সার বরাদ্দ পেয়েছেন, তা কৃষকের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এতে মাঠপর্যায়ে সঙ্কট আরো প্রকট হচ্ছে।

তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দিলশাদ জাহান এসব অভিযোগ আংশিক অস্বীকার করে বলেন, উপজেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই এবং শিলাবৃষ্টির ক্ষতিটাও তেমন বড় আকারের নয়। ডিজেল সঙ্কট প্রসঙ্গে তিনি জানান, কৃষক ছাড়াও কিছু মানুষ অপ্রয়োজনে মজুদ করায় সাময়িক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে।

সব মিলিয়ে বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন পরিস্থিতিতে ঘাটাইলের কৃষকেরা উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। সময়মতো সঙ্কট নিরসন না হলে এর প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থায়, এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।