নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার

বাংলাদেশে সৌরশক্তি, বর্জ্য ও জলবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে চাহিদা অনুপাতে সীমিত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুত এর বৃদ্ধি সম্ভব। এ লক্ষ্যে কালক্ষেপণ না করে উল্লিখিত তিনটি ক্ষেত্র ছাড়াও আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে ভূ-তাপ, সমুদ্রের ঢেউ, সমুদ্রের তাপ, জোয়ার-ভাটা ও হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে। আর এর মাধ্যমে আশা করা যায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কটের সমাধান ত্বরান্বিত হয়ে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে

নবায়নযোগ্য জ্বালানি হলো প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত শক্তি; যা কখনো নিঃশেষ হয় না। বারবার ব্যবহারযোগ্য। এটি পরিবেশবান্ধব ও জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প, যা কার্বন নিঃসরণ কমায়। বিভিন্ন প্রাকৃতিক উৎস, যেমন সূর্যের আলো ও তাপ, বায়ুপ্রবাহ, জলপ্রবাহ, জৈবশক্তি, ভূ-তাপ, সমুদ্র-তরঙ্গ, সমুদ্র-তাপ, জোয়ার-ভাটা, হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল ইত্যাদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তির উৎস।

পৃথিবীব্যাপী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ২০৫০ সাল নাগাদ জনমানুষের বিদ্যুতের চাহিদার ৮৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে পূরণ হবে। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ ভবিষ্যৎ বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে জাতিসঙ্ঘসহ পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো উৎসাহ প্রদান অব্যাহত রেখেছে। বিশ্বে জীবাশ্ম জ্বালানির বেশির ভাগ ব্যয় হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন, মোটরযান চলাচল ও গৃহস্থালির তাপ উৎপাদনে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাসে প্রয়োজন টেকসই বিদ্যুৎব্যবস্থা, টেকসই যানবাহনব্যবস্থা এবং গ্রিন টেকনোলজি সমৃদ্ধ শক্তি সাশ্রয়ী গৃহস্থালি পণ্যের প্রবর্তন। এ বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ২—৩ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস থেকে আসে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস থেকে আপাতত ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা-২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সূর্যের আলো ও তাপকে সৌরশক্তি বলা হয়। প্রধানত দু’টি উপায়ে সূর্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করা যায়। প্রথমত, সূর্য থেকে আলোকশক্তি সংগ্রহ করে এবং দ্বিতীয়ত, সূর্য থেকে তাপশক্তি সংগ্রহ করে। আলোকশক্তি সংগ্রহে ব্যবহার করা হয় ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট বা আলোকতড়িৎ ক্রিয়া। আলোকসংবেদী অর্ধ-পরিবাহী দ্বারা তৈরি ফোটোভোল্টাইক সেল (পিভি) ব্যবহার করে তৈরি করা হয় সোলার প্যানেল। তাপশক্তি সংগ্রহ করতে ব্যবহার করা হয় কনসেনট্রেটেড সোলার পাওয়ার বা কেন্দ্রীভূত সৌরশক্তি পদ্ধতি।

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সোলার প্যানেল তৈরির কাজে নিয়োজিত। প্রযুক্তিটি সহজলভ্য হওয়ায় গ্রামের অনেকে চাহিদা মেটাতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগ জাতীয় গ্রিডের সাথে সংযুক্ত নয়, এ কারণে গ্রামে ব্যবহৃত সৌর বিদ্যুতের একটি বড় অংশ জাতীয় গ্রিডের বাইরে। দেশে বর্তমানে সৌরশক্তি ব্যবহার করে প্রায় এক হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বাংলাদেশের বৃহত্তম সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কেন্দ্রটি থেকে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে।

বায়ুপ্রবাহ দ্বারা সৃষ্ট বিদ্যুৎ বায়ুশক্তি নামে অভিহিত। বায়ুশক্তি কাজে লাগিয়ে জেনারেটরের টারবাইন ঘুরিয়ে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এ ক্ষেত্রে বায়ু যখন টারবাইনের ব্লেডের মধ্য দিয়ে যায় তখন বায়ুর শক্তি এ ব্লেডগুলো ঘুরায়। ব্লেডগুলোর সাথে রোটর সংযুক্ত থাকে যা ব্লেডগুলো ঘূর্ণনের ফলে সক্রিয় হয়। এ রোটর জেনারেটরের সাথে সংযুক্ত থাকে, যার ঘূর্ণনের ফলে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশের প্রধান বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মূলত উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত। কক্সবাজারের খুরুশকুলে দেশের বৃহত্তম বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট। তাছাড়া ফেনীর সোনাগাজীতে ০.৯ মেগাওয়াট, কুতুবদিয়ায় এক মেগাওয়াট এবং সিরাজগঞ্জে দুই মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। ইতোমধ্যে মোংলায় ৫৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী কক্সবাজারে ডেনমার্কের উদ্যোগে ১৩০ কোটি ডলার (১৪ হাজার কোটি টাকার অধিক) ব্যয়ে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব বিবেচনাধীন। এর বাইরে পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও পায়রা এবং চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

জলপ্রবাহ থেকে সৃষ্ট বিদ্যুৎকে জলবিদ্যুৎ বলা হয়। জলবিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য শক্তির সবচেয়ে পরিচিত মাধ্যম। সাধারণত পাহাড়ি এলাকায় নদীতে বিশাল আকৃতির বাঁধ দিয়ে পানির উচ্চতা বাড়ানো হয়। সেই পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে নিচে পড়তে দিয়ে তার ধাক্কায় টারবাইন ঘুরানো হয়। এভাবে জলবিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়।

বাংলাদেশে জলপ্রবাহ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একমাত্র কেন্দ্র কর্ণফুলী জল বিদ্যুৎকেন্দ্র। পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলায় কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করে কর্ণফুলী জল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হয়। পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে আমেরিকার অর্থায়নে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে হাত দেয়। ১৯৬২ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। এ বাঁধের পাশে ১৬টি জলকপাট সংযুক্ত ৭৪৫ ফুট দীর্ঘ একটি পানি নির্গমন পথ বা স্পিলওয়ে আছে। এ স্পিলওয়ে প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ লাখ ২৫ হাজার কিউসেক ফুট পানি নির্গমন করতে পারে। কাপ্তাই বাঁধের কারণে ৫৪ হাজার একর কৃষিজমি ডুবে যায়, যা ওই এলাকার কৃষিজমির ৪০ শতাংশ। জমি ডুবে যাওয়ায় যে কৃত্রিম হ্রদটি সৃষ্টি হয়েছে এটি কাপ্তাই হ্রদ নামে পরিচিত।

১৯৬২ সালে কর্ণফুলী জল বিদ্যুৎকেন্দ্রে দু’টি ৪০ মেগাওয়াটের জেনারেটর স্থাপন করা হয়। ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৩ নম্বর ইউনিটের কাজ ১৯৮২ সালে শেষ হয়। ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন চতুর্থ ও পঞ্চম ইউনিটের কাজ ১৯৮৮ সালে শেষ হয়। বর্তমানে কর্ণফুলী জল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মোট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট। পানির প্রবাহ ছাড়া আর কোনো জ্বালানির প্রয়োজন না পড়ায় কর্ণফুলী জল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশের একমাত্র জল বিদ্যুৎকেন্দ্র, যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হয় ২৫ পয়সারও কম। তা ছাড়া রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুরের কিছু এলাকায় ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

মানুষ অথবা পশু-পাখির বিষ্ঠা এবং পচনশীল বর্জ্য থেকে যে জৈবশক্তি তৈরি করা হয় এটিকে বায়ুগ্যাস বলা হয়। এ গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদন ও রান্না উভয় কাজে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় গোবর ও পচনশীল বর্জ্য ব্যবহার করে রান্না ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বায়োগ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবহৃত বর্জ্য জৈবসার হিসেবে কৃষিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে আড়াই লক্ষাধিক পরিবার বায়োগ্যাস ব্যবহার করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে, যা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে। দেশের বিভিন্ন হাঁস-মুরগি ও গরুর খামারে বায়োগ্যাস ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ বিদ্যুতের চাহিদা অকেকাংশে মেটানো হচ্ছে।

সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা গ্রামীণ শক্তি এবং ইডকল বায়ুগ্যাস প্রসারে কাজ করছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে বর্তমানে শহরস্থ আমিনবাজারে শহুরে বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ চলমান রয়েছে। দৈনিক তিন হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করে দু’টি ইউনিটের মাধ্যমে ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৮ সাল নাগাদ প্রকল্পটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে মর্মে আশা করা যায়। যশোর পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার বিভাগের যৌথ উদ্যোগে শহরস্থ ঝুমঝুমপুর এলাকার হামিদপুরে বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে ২০১৯ সালে একটি প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়। এ প্ল্যান্ট থেকে দৈনিক ৪০-৫০ টন বর্জ্য ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ও জৈবসার উৎপাদন করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে হালিশহরে বর্জ্য ব্যবহার করে ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন। তা ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিভিন্ন হলের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ভূ-তাপ শক্তি বা জিওথার্মাল এনার্জি পৃথিবীর অভ্যন্তরের শক্তি। পৃথিবীর কেন্দ্র একটি গলিত ধাতুর পিণ্ড, যার তাপমাত্রা প্রায় ছয় হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এ তাপকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড প্রভৃতি দেশে ভূ-তাপ শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। আমাদের দেশে এ পদ্ধতি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া এখনো উদ্ভাবন হয়নি।

বাংলাদেশে সমুদ্রের ঢেউ বা তরঙ্গ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলমান। বাগেরহাটের মোংলায় সমুদ্রের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। তাছাড়া কুয়াকাটা ও সেন্টমার্টিনে বঙ্গোপসাগরের ঢেউ ব্যবহার করে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। বঙ্গোপসাগরে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৯ মিটার ঢেউয়ের উচ্চতা পরিমাপ করা হয়েছে, যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

বাংলাদেশে সমুদ্রের তাপকে (ওশান থার্মাল এনার্জি) কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত আশানুরূপ কোনো প্রকল্প হাতে নেয়া হয়নি। সমুদ্রের তাপ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি ব্যয়বহুল। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জিং হলেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জাপান এ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

বাংলাদেশে জোয়ার-ভাটার পানির স্র্রোত কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ ব্যাপারে বরগুনার পায়রায় স্লুইসগেট ব্যবহারে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে সফলতা পাওয়া গেছে। এ সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া, মোংলা ও কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকায় জোয়ার-ভাটার শক্তি কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ভাবা হচ্ছে। এটি একটি নবায়নযোগ্য, পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি শক্তির উৎস। বাংলাদেশে জোয়ার-ভাটার প্রবাহ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, চীন, যুক্তরাজ্য ও কানাডা এ বিষয়ে প্রভূত উন্নতি করেছে।

হাইড্রোজেনকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পদ্ধতিকে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল বলা হয়। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন ফুয়েল অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। ২০১৮ সালে থেকে বাংলাদেশে হাইড্রোজেন এনার্জি নিয়ে কাজ শুরু হলেও ২০৩৫ সালের মধ্যে হাইড্রোজেন সেল থেকে জ্বালানি উৎপাদনের পরিকল্পনা আছে। বর্তমানে চীন, জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এ দেশগুলো পরিবেশ দূষণ কমাতে এবং গ্রিন এনার্জি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে জ্বালানি সঙ্কট দেখা দিয়েছে তা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। এ সঙ্কট মোকাবেলায় প্রয়োজন আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানি ও এলএনজি গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত ২০৫০ সালের মধ্যে তা ৮৫ শতাংশে উন্নীত করা। এখন বাংলাদেশে সৌরশক্তি, বর্জ্য ও জলবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে চাহিদা অনুপাতে সীমিত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুত এর বৃদ্ধি সম্ভব। এ লক্ষ্যে কালক্ষেপণ না করে উল্লিখিত তিনটি ক্ষেত্র ছাড়াও আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে ভূ-তাপ, সমুদ্রের ঢেউ, সমুদ্রের তাপ, জোয়ার-ভাটা ও হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে। আর এর মাধ্যমে আশা করা যায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কটের সমাধান ত্বরান্বিত হয়ে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]