ব্যয়বহুল চুক্তির বোঝা কতদিন

বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পরিকল্পনাহীন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি অসম চুক্তির কারণেই এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে- জনগণ আর কতদিন এই ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা বহন করবে?

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হলেও জনগণকে এখনো গোনতে হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক, শুধু কেন্দ্র প্রস্তুত রাখার জন্যই বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করছে সরকার। গত এক দশকে এই খাতে ব্যয় হয়েছে বিপুল অঙ্কের টাকা, যার বড় অংশই শেষ পর্যন্ত চাপ হিসেবে পড়েছে সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিল, জ্বালানি মূল্য ও রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির ওপর। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পরিকল্পনাহীন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি অসম চুক্তির কারণেই এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে- জনগণ আর কতদিন এই ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা বহন করবে?

কী এই ক্যাপাসিটি চার্জ?

বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ হলো এমন একটি অর্থ, যা সরকার বা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিদ্যুৎকেন্দ্রকে শুধু প্রস্তুত অবস্থায় রাখার জন্য পরিশোধ করে। কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, নির্দিষ্ট চুক্তি অনুযায়ী এই অর্থ দিতে হয়।

মূলত দ্রুত বিদ্যুৎ সঙ্কট মোকাবেলার জন্য ২০০৯ সালের পর বিপুলসংখ্যক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেয় সরকার। তখন যুক্তি ছিল- বিদ্যুৎ ঘাটতি দূর করতে জরুরি ভিত্তিতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে ওঠে। ফলে অনেক কেন্দ্র বছরের বড় সময় অলস পড়ে থাকলেও মালিকরা ঠিকই পাচ্ছেন ক্যাপাসিটি চার্জ।

উৎপাদন সক্ষমতা বেশি, তবুও কেন এই ব্যয়?

বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সরকারি হিসাব অনুযায়ী চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। পিক আওয়ারেও যে পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি সক্ষমতা কাগজে-কলমে বিদ্যমান। কিন্তু বাস্তবে জ্বালানি সঙ্কট, গ্যাস ঘাটতি, ডলার সঙ্কট ও সঞ্চালন সীমাবদ্ধতার কারণে সব কেন্দ্র চালানো সম্ভব হয় না।

ফলে অনেক কেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হয়। অথচ এসব কেন্দ্রের সাথে সরকারের চুক্তি এমন যে, কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও মালিকপক্ষকে ‘ক্ষমতা ভাড়া’ বা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে। অর্থাৎ জনগণ এমন বিদ্যুতের জন্যও টাকা দিচ্ছে, যা তারা ব্যবহারই করছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা বিশ্লেষণের ঘাটতি এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় কেন্দ্র অনুমোদনের কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

কত টাকা গেছে এই খাতে?

গত এক দশকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকারের ব্যয় কয়েক লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি নথিতে উঠে এসেছে। প্রতি বছরই এই ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে তেলভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলোতে ব্যয় তুলনামূলক বেশি।

বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হলেও এসব কেন্দ্রের জন্য সরকারকে নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ফলে পিডিবির লোকসানও ক্রমাগত বাড়ছে। এই লোকসান মেটাতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, আবার বিদ্যুতের দামও বাড়াতে হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শেষ পর্যন্ত এই ব্যয় জনগণের পকেট থেকেই যাচ্ছে- কখনো বিদ্যুৎ বিলের মাধ্যমে, কখনো করের মাধ্যমে, আবার কখনো মূল্যস্ফীতির চাপ হিসেবে।

সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়ছে?

ক্যাপাসিটি চার্জের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। গত কয়েক বছরে একাধিকবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। শিল্প খাতেও বিদ্যুতের ব্যয় বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে উৎপাদন খরচ ও বাজার দরে।

একজন নিম্ন বা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বিদ্যুৎ বিল এখন বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সাথে শিল্প উদ্যোক্তারাও উচ্চ বিদ্যুৎ ব্যয়ের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের সাথে ক্যাপাসিটি চার্জ যুক্ত হওয়ায় বিদ্যুতের সামগ্রিক খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এতে দেশের অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হচ্ছে।

কেন বাড়ছে পিডিবির লোকসান?

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দীর্ঘদিন ধরেই বড় অঙ্কের আর্থিক ঘাটতির মুখে রয়েছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ক্রয় ও ক্যাপাসিটি চার্জ।

পিডিবি তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করলেও বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি প্রয়োজন হচ্ছে। এই অর্থ জোগাতে সরকারকে বাজেট থেকে সহায়তা দিতে হয়, যা অন্য উন্নয়ন খাতের ওপরও চাপ তৈরি করে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক টেকসইতা আরো দুর্বল হবে।

বিতর্কিত চুক্তি ও দায়মুক্তির প্রশ্ন

বিদ্যুৎ খাতের অনেক চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধির নামে করা কিছু চুক্তিতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া বিশেষ আইনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে দায়মুক্তির সুযোগও দেয়া হয়েছিল। ফলে চুক্তির স্বচ্ছতা, ব্যয় যৌক্তিকতা এবং প্রকৃত প্রয়োজন নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কার্যকর জবাবদিহি গড়ে ওঠেনি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় জনগণের অর্থের অপচয় বেড়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে পিছিয়ে পড়া

বিশ্ব যখন ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এখনো ব্যয়বহুল তেল ও এলএনজিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় চাপ বহন করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সময়মতো সৌর ও বায়ুভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো হতো, তাহলে এত বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জের প্রয়োজন হতো না। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয় কম।

তাদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার না দিলে ব্যয় সঙ্কট আরো বাড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই করতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ জরুরি। আর তা হলো, অতিরিক্ত কেন্দ্র পুনর্মূল্যায়ন

চাহিদার তুলনায় যেসব কেন্দ্র অপ্রয়োজনীয়, সেগুলোর চুক্তি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো

নতুন চুক্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ভরতা কমাতে হবে এবং বাস্তব উৎপাদনভিত্তিক অর্থপ্রদানের দিকে যেতে হবে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ খাতের সব চুক্তি, ব্যয় ও ভর্তুকির তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।