মুহা: আব্দুল আউয়াল রাজশাহী ব্যুরো
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ঐতিহাসিক সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর আবারো চালুর দ্বারপ্রান্তে। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে যাওয়া এই নৌপথ ৫৯ বছর পর ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পুনরায় চালু হলেও প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত জটিলতায় কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বন্দরটি।
সুলতানগঞ্জ থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের মায়া (ধুলিয়ান) নৌবন্দরের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। একসময় এটি ছিল দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্য রুট। পুনরায় চালুর পর পরীক্ষামূলকভাবে পাথর ও গার্মেন্ট ঝুট পরিবহনের ১০টি সফল ট্রিপ সম্পন্ন হয়।
রাজশাহীতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদের সভাপতিত্বে বিআইডব্লিউটিএ, এনবিআর, বিজিবি, নৌ-পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বন্দরটি দ্রুত চালুর পক্ষে মত দেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ ইতোমধ্যে ২৫ বছরের জন্য জমি ইজারা নিয়েছে, নতুন স্থাপনা নির্মাণ করেছে এবং নাব্যতা নিশ্চিত করতে ড্রেজিং কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। নৌ-পুলিশ ফাঁড়িকে থানায় উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দরটি চালু হলে ভারত থেকে পাথর, মার্বেল, কয়লা, খনিজ বালু ও বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানি এবং বাংলাদেশ থেকে বস্ত্র, পাটজাত পণ্য, মাছ, আমসহ কৃষিপণ্য রফতানির সুযোগ সৃষ্টি হবে। নদীপথে পরিবহন ব্যয় কম হওয়ায় ব্যবসায়ীদের খরচ কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হাসেন আলী বলেন, সোনামসজিদ স্থলবন্দরের পাশাপাশি সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর উত্তরাঞ্চলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও স্থানীয় অর্থনীতির সম্প্রসারণ ঘটবে।
বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদের মতে, এনবিআরের অনুমোদন মিললেই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে। তখন পদ্মার বুকে আবারো প্রাণ ফিরে পাবে ঐতিহাসিক এই নৌবাণিজ্য পথ।
প্রায় ছয় দশক পর সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের পুনর্জাগরণ শুধু একটি বন্দর চালুর ঘটনা নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। এখন সবকিছু নির্ভর করছে এনবিআরের চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর। অনুমোদন মিললেই পদ্মার তীরে শুরু হতে পারে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার নতুন অধ্যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা ও বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার ব্যবসায়ীরা সরাসরি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের সুবিধা পাবেন। বর্তমানে এসব অঞ্চলের আমদানি-রফতানির বড় অংশ সোনামসজিদ স্থলবন্দর বা দেশের অন্যান্য দূরবর্তী বন্দরনির্ভর হওয়ায় পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটোই বেশি লাগে। সুলতানগঞ্জ নৌপথ চালু হলে স্বল্প দূরত্বে কম খরচে পণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বৈধ রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং উত্তরাঞ্চলে নতুন শিল্প ও গুদামভিত্তিক বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



