সংসদে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন উত্থাপন, ১২ দফা সুপারিশ

জ্বালানি নিরাপত্তায় ৩ মাসের কৌশলগত মজুদের সুপারিশ

Printed Edition

সংসদ প্রতিবেদক

দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৌশলগত জ্বালানি তেলের মজুদ কমপক্ষে তিন মাসের সক্ষমতায় উন্নীত করা, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় গঠিত বিশেষ কমিটি। একই সাথে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, অবৈধ মজুদ ও পাচার রোধ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ ১২ দফা সুপারিশ করেছে বিশেষ কমিটি। অন্য দিকে, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ১০ দফা সুপারিশ করা হয়েছে।

গতকাল রোববার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিশেষ কমিটির সভাপতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উত্থাপিত প্রতিবেদনে এ সুপারিশ তুলে ধরা হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে গত ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বৈঠকে জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে ১০ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। যেখানে সরকারি দলের পাঁচজন এবং বিরোধী দল থেকে পাঁচজন সদস্য রাখা হয়।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে সভাপতি করে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে এ কমিটি গঠিত হয়, যার মেয়াদ ছিল ৩০ দিন। কার্যপরিধি ছিল সাম্প্রতিক জ্বালানি নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ সংসদে প্রদান করা। গত ৩ মে ও ১৯ মে দু’দফা বিশেষ কমিটির বৈঠকে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে ১২ দফা সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়।

বিশেষ কমিটির সুপারিশে বলা হয়, জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুদ সম্প্রসারণ করে কমপক্ষে তিন মাসের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন করে ডিজিটাল মনিটরিং চালু করতে হবে। অবৈধ মজুদ ও পাচার রোধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার (এলএনজি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি) বৃদ্ধি করতে হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপ লাইন ও এসপিএম প্রকল্প এবং ইআরএল-২ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। জনসচেতনতা কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। বিপিসির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্বালানি পণ্য আমদানির বিষয়ে প্রয়োজনীয় স্টাডি করা প্রয়োজন। রুফটপে সোলার প্যানেল স্থাপন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সে সোলার চলছে কিনা, এর তদারকি জোরদার করতে হবে। সিস্টেম লস হ্রাস করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা প্রণয়নপূর্বক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তেল, গ্যাস, কয়লা, সোলার, উইন্ড এ সকল খাত হতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা প্রণয়নপূর্বক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া বিশেষ কমিটির কার্যপরিধির আলোকে বিরোধী দলের পক্ষ হতে কোনো সুপারিশ পাওয়া গেলে তা রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা দেয়া হয়।

বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক জ্বালানি পরিস্থিতি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি, অবকাঠামো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে অধিকতর স্থিতিশীল, বহুমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করা সময়ের দাবি। বিশেষ কমিটি মনে করে, সাম্প্রতিক জ্বালানি পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। বর্তমান সঙ্কট সফলভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বহুমুখী জ্বালানি উৎস নিশ্চিতকরণ এবং সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ, সংসদীয় তদারকি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনগণের সহযোগিতার মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরো শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে কমিটি।

প্রতিবেদনে বিরোধী দলের ১০দফা সুপারিশও যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে সুপারিশে বলা হয়েছে, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং তার ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা পূর্বাভাসের জন্য সরকারের উচিত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের কমিটির মাধ্যমে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করা। সরকারের চাহিদার অতিরঞ্জিত পূর্বাভাস সৃষ্টি করা উচিত নয়। আপাতদৃষ্টিতে, দেশে স্থাপিত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। কয়লা সম্পদ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সবচেয়ে সাশ্রয়ী বিকল্প হওয়ায় আমরা মনে করি এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। বড় পুকুরিয়া থেকে কয়লা অন্যান্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করা অথবা স্বতঃস্ফূর্ত দাহ এড়াতে বিকল্প খাতে বিক্রির জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ সমাধান খুঁজতে হবে।

আমদানিকৃত গ্যাসের মূল্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাসের তুলনায় অনেক বেশি, এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে দেশীয় গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি, বাপেক্স ও জাতীয় সক্ষমতা শক্তিশালী করার মাধ্যমে অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং নতুন দেশীয় সম্পদের সম্ভাবনা উন্মুক্ত করতে দ্রুততর অফশোর জ্বালানী অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সর্বোচ্চ করা যেতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে তুলনামূলক কম ব্যয়ে উৎপাদন বাড়াতে গ্যাস কূপগুলোর ওয়ার্কওভার গ্রহণ এবং দ্রুত ফলদায়ক কুপগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহে অর্থবহ বৃদ্ধি নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস অবকাঠামো সম্প্রসারণে ভোলা, জামালপুর ও জকিগঞ্জ ক্ষেত্র থেকে পাইপলাইনের সংযোগ উন্নয়ন এবং উৎপাদন সক্ষমতাকে সহায়তা করতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিযোগের মাধ্যমে স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সহায়তায় স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

সরকার কমিটিকে সিলেটে অপরিশোধিত তেলের কূপ আবিষ্কারের বিষয়ে জানিয়েছে। গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশের অন্যান্য স্থানে অপরিশোধিত তেলের কূপ পাওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারকে স্বচ্ছতার সাথে অন্যান্য স্থানে অপরিশোধিত তেল অনুসন্ধান অব্যাহত রাখতে হবে।

জ্বালানি আমদানি ও পরিশোধন অবকাঠামো শক্তিশালী করতে নতুন স্থাপিত এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মর্নিং) অবিলম্বে চালু করা; জ্বালানি হ্যান্ডলিং দক্ষতা বাড়াতে এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে সিঙ্গেল পয়েন্ট মর্নিং-এর কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু; ইস্টার্ন রিফাইনারি-এর দ্বিতীয় পর্যায়ের সম্প্রসারণ পুরোপুরি অর্থায়ন করা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিচালনাগত সুবিধা বাড়াতে বহুমুখী অপরিশোধিত তেল পরিশোধন, বিশেষত শুধু লাইট ক্রুডের পরিবর্তে রিফাইনারি মিশ্রণে হেভি ক্রুড অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তেল ডিপো ও টার্মিনালে মজুদ তেলের পরিমাণ নিরূপণের জন্য স্বয়ংক্রিয় গেজিং ব্যবস্থা এবং তেল ট্যাংকার থেকে গ্রাহক পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তেল বিতরণের জন্য আধুনিক/ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

বৃহৎ পরিসরের সৌরবিদ্যুৎ বাস্তবায়ন এবং স্টোরেজ ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করা যেতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে রুফটপ সোলার গ্রহণে প্রণোদনা দিতে নেট মিটারিং নীতি কার্যকর করা উচিত, ডিস্ট্রিবিউটেড সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুততর করতে সহায়ক নীতিমালাও চালু করা উচিত এবং নির্ভরযোগ্যতা উন্নত করা ও অনিয়মিত উৎপাদন ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যাটারি স্টোরেজ সমন্বিত করা প্রয়োজন। জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্য আনয়ন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যে বৃহৎ পরিসরের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোকে উৎসাহিত করা উচিত। ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমান আনুমানিক এক শতাংশ থেকে জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ১০ শতাংশে উন্নীত করা উচিত। তবে যথাযথ প্রযুক্তিগত ও আর্থিক বিষয়গুলো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে বর্ষার দিন ও শীত মৌসুমে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনের তারতম্য মোকাবেলা করা যায় এবং সৌর বিদ্যুৎকে বেস লোড হিসেবে ব্যবহারের প্রত্যাশার কারণে ক্যাপাসিটি চার্জ সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া যায়।

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ বাঁধ থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা, যদিও অসম বৃষ্টিপাতের কারণে উৎপাদন ব্যাপকভাবে ওঠানামা করে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে উৎপাদন আরো অনিশ্চিত হতে পারে। তাই পার্বত্য এলাকায় মাইক্রো-হাইড্রোর সম্ভাবনা নিরূপণে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করতে হবে। শক্তিশালী নদীপ্রবাহ ব্যবহার করে আরো বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা অনুসন্ধানে সরকারকে টেকসই জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিশেষজ্ঞ, প্রতিষ্ঠান এবং বিরোধী দলগুলোর সাথে পরামর্শ করে একটি কৌশলগত রোডম্যাপ প্রণয়ন করা যেতে পারে বলে আমরা মনে করি, যাতে টেকসই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বহুমুখীকরণ বিষয়ে বলা হয়েছে, কোনো একক জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বহুমখীকরণের জোর সুপারিশ করছি। হাইড্রোজেন ফুয়েল প্রযুক্তি, বায়োগ্যাস ও বর্জ্য থেকে জ্বালানি বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা করা যেতে পারে। একটি সমীক্ষা কমিশন করতে হবে। পদ্মা ব্যারাজ থেকে ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।

জ্বালানি সঙ্কটকালীন সময়ে সরকারি দফতরগুলো কম যানবাহন ব্যবহার করতে পারে এবং গাড়ির আসন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে।