সংবাদ বিশ্লেষণ

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনে সীমাবদ্ধতা : আইন রাজনীতি ও বাস্তবতা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

রোহিঙ্গা সঙ্কট আজ একদশকেরও বেশি সময় ধরে দণি এশিয়ার সবচেয়ে জটিল মানবিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর একটি। প্রায় ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করলেও তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি। আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়া বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এই সঙ্কটকে বৈশ্বিক আইনি পরিসরে দৃশ্যমান করেছে, কিন্তু বাস্তব সমাধান এখনো অধরা।

২০১৯ সালে গাম্বিয়ার উদ্যোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের মামলা দায়েরের পর আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ২০২০ সালে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ, প্রমাণ সংরণ এবং নিয়মিত প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেয়। এই আইনি পদপে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের মনোযোগ সৃষ্টি করলেও মিয়ানমারের আচরণে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। বরং ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়ে।

এখানে মূল সঙ্কটটি হলো আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগমতার সীমাবদ্ধতা। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় আইনত বাধ্যতামূলক হলেও তা বাস্তবায়নের জন্য নিজস্ব কোনো বলপ্রয়োগ মতা নেই। অর্থাৎ আদালত সিদ্ধান্ত দিতে পারে, কিন্তু তা কার্যকর করা নির্ভর করে রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। এই কাঠামোগত দুর্বলতা রোহিঙ্গাদের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচারকে প্রায়শই প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ করে দেয়।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা। আদালতের রায় বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে নিরাপত্তা পরিষদের হস্তপে প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেখানে স্থায়ী সদস্যদের ভেটো মতা একটি বড় রাজনৈতিক বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোরব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগে ভেটো ব্যবহার বা বিরোধিতা করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক আইনি চাপ বাস্তব রাজনৈতিক পদেেপ রূপ নিতে পারছে না।

এই সঙ্কটের আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো সময়ের ব্যবধান। আন্তর্জাতিক বিচারপ্রক্রিয়া সাধারণত দীর্ঘ সময়সাপে, যেখানে রোহিঙ্গাদের সঙ্কট তাৎণিক মানবিক সমাধান দাবি করে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা সীমিত কর্মসংস্থান, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে জীবনযাপন করছে। ফলে অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে, যা নতুন মানবিক বিপর্যয় তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক আইন এখানে মূলত তিনটি ভূমিকা রাখছেÑ আইনি দায় নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখা এবং নথিভুক্তকরণ। তবে এই তিনটি ভূমিকা বাস্তব নিরাপত্তা বা প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। ফলে আইনি অগ্রগতি থাকলেও রাজনৈতিক অচলাবস্থা সঙ্কটকে দীর্ঘায়িত করছে।

রোহিঙ্গা সঙ্কটের েেত্র সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো “আইনি স্বীকৃতি বনাম বাস্তব প্রয়োগ”। আদালতের কার্যক্রম মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায় নির্ধারণ করছে এবং আন্তর্জাতিক নৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে, কিন্তু কোনো কার্যকর বাস্তব ফলাফল তৈরি করতে পারছে না। ফলে আন্তর্জাতিক আইন একধরনের “প্রতীকী ন্যায়বিচার” প্রদান করলেও “বাস্তব ন্যায়বিচার” নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো প্রয়োগমতা ছাড়া আন্তর্জাতিক আইন কতটা কার্যকর? রোহিঙ্গা সঙ্কট দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কাগজে-কলমে বাধ্যতামূলক আইনও রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে অনেক সময় অকার্যকর হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং শক্তিধর দেশগুলোর অবস্থান আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতাকে সীমিত করে দেয়।

তবুও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ভূমিকা একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয়। এটি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইনি দায় প্রতিষ্ঠা করছে, ভবিষ্যৎ জবাবদিহিতার ভিত্তি তৈরি করছে এবং রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনায় জীবিত রাখছে। কিন্তু এই অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর সাথে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তব প্রয়োগ যুক্ত হবে।

সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন সঙ্কট প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক আইন, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং মানবিক প্রয়োজনের মধ্যে একটি গভীর ফাঁক বিদ্যমান। এই ফাঁক পূরণ না হলে কেবল আইনি প্রক্রিয়া রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে পারবে না।