- আড়াই বছরের কাজ এখন সাড়ে ৭ বছরে
- কাজের অগ্রগতিতে পরিকল্পনা কমিশনের অসন্তোষ প্রকাশ
- ৫ বছর পর এখন সেতুর নকশা পরিবর্তনের প্রস্তাব
বছরের পর বছর চলছে দেশের উত্তরাঞ্চলে জরাজীর্ণ, অপ্রশস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি সেতু প্রতিস্থাপন কার্যক্রম। দেশজুড়ে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি সেতু প্রতিস্থাপনের জন্য নেয়া সরকারি প্রকল্প নিজেই এখন অনিশ্চয়তা, ধীরগতি ও ঝুঁকিতে পড়েছে। আড়াই বছরের প্রকল্পের কাজ এখন পাঁচ বছর অতিক্রম করতে যাচ্ছে। প্রস্তাব দেয়া হয়েছে অসমাপ্ত ৪১.২৪ শতাংশ কাজ শেষ করতে সাড়ে সাত বছর অর্থাৎ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত সময় লাগবে। সময়মতো কাজ শুরু না হওয়া, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, ঠিকাদারের দুর্বলতা এবং অনুমোদনের পর ডিজাইন নকশা পরিবর্তনে প্রকল্পটি ঝুঁকিতে। পাঁচ বছরে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতিতে পরিকল্পনা কমিশন অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জরাজীর্ণ, পুরানো বেইলি সেতু ব্যবহার করেই যান চলাচল চালিয়ে যেতে হচ্ছে, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবনার দলিল থেকে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে এখনো কয়েক শতাধিক পুরনো বেইলি সেতু চালু রয়েছে। এসব সেতুর অনেকগুলোই মেয়াদোত্তীর্ণ, অতিরিক্ত ভারবহন করছে এবং নিয়মিত মেরামতের মাধ্যমে সচল রাখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব সেতু প্রতিস্থাপনের দাবি থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি আশানুরূপ নয়।
উত্তরাঞ্চলের রংপুর সড়ক জোনের আওতাধীন আটটি সড়ক বিভাগের সড়কগুলোর বিভিন্ন পয়েন্টে বেশ কয়েকটি জরাজীর্ণ, অপ্রশস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি সেতু রয়েছে। এসব জরাজীর্ণ, অপ্রশস্ত বেইলি সেতু এবং ঝুঁকিপূর্ণ আরসিসি/পিসি গার্ডার সেতুসহ কয়েকটি কালভার্ট প্রতিস্থাপন করা হলে যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি বহুলাংশে কমে আসবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আওতায় সড়ক ও জনপথ অধিদফতর কর্তৃক বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মোট ৮৬১ কোটি ৩৮ লাখ ৯২ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই ২০২১ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ মেয়াদে অর্থাৎ আড়াই বছরে সমাপ্তের জন্য ১০ আগস্ট ২০২১ সালে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। পরবর্তীতে পরিকল্পনা কমিশন থেকে প্রকল্পটির প্রথমবার ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়া মেয়াদ দেড় বছর বাড়িয়ে জুন ২০২৫ করা হয়। এর পর আবার দ্বিতীয়বার ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই মেয়াদ আরো এক বছর বাড়িয়ে জুন ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়। এতে প্রকল্পের মেয়াদ পাঁচ বছরে উন্নীত হয়। এখন আবার বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন অর্থাৎ সাড়ে সাত বছর করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন খাতে ব্যয় হ্রাস বদ্ধি করে মোট ব্যয় ৩.২২৫ শতাংশ বা ২৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা কমিয়ে এখন মোট খরচ ৮৩৩ কোটি ৬০ লাখ ৮৯ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
প্রকল্পের কাজ হলো:
এই অঞ্চলে ৫০টি সেতু জরাজীর্ণ, যার মধ্যে ২৬টি বেইলি সেতু, ২৪টি অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সেতু ও কালভার্ট প্রতিস্থাপন। লালমনিরহাট, জয়পুরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, বগুড়া, গাইবান্ধা, দিনাজপুর এবং ঠাকুরগাঁও জেলা।
মার্চ-২৬ পর্যন্ত অগ্রগতি:
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের তথ্য হলো, প্রকল্পটির মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ৪৪১ কোটি চার লাখ ৮০ হাজার টাকা বা ৫১.২০ শতাংশ অর্থ খরচের বিপরীতে বাস্তব অগ্রগতি ৫৮.৭৬ শতাংশ।
ধীরগতি ও সময় বৃদ্ধির কারণ:
বাস্তবায়নকারী সংস্থা, সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন এলএ কেসের ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া যথাসময়ে সম্পন্ন না হওয়ায় প্রকল্পটির বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়েছে। এছাড়া, বাস্তবতার নিরিখে নতুন পুনর্বিন্যাসকৃত ডব্লিউপি-১০ এ প্যাকেজের দরপত্র মূল্যায়ন অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন।
কাজ কমলেও খরচ বেড়েছে:
সংশোধিত প্রকল্প দলিল থেকে জানা গেছে, মূল অনুমোদিত ডিপিপিতে ২৬.৫৬ হেক্টর জমি এবং জমির উপরিস্থিত সম্পত্তি বাবদ ১২৫ কোটি ২৮ লাখ ৫৬ হাজার টাকার প্রাক্কলন অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর প্রথম সংশোধিত ডিপিপিতে ২১.৭১ হেক্টর জমি এবং জমির উপরিস্থিত সম্পত্তি বাবদ ১৪০ কোটি তিন লাখ ১৮ হাজার টাকায় প্রস্তাব করা হয়েছে। এখানে জমির পরিমাণ ৪.৮৫ হেক্টর হ্রাস পেলেও জমির উপরিস্থিত সম্পত্তির পরিমাণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ১৪ কোটি ৭৪ লাখ ৬২ হাজার টাকা। আর ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সড়ক পরিবহন উইং থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় নতুন সড়ক নির্মাণ (সারফের্সিংসহ) খাতে ১.৬২ কিলোমিটার বৃদ্ধি করে ৪১ কোটি ৩৪ লাখ ৯২ হাজার টাকার পরিবর্তে ৫১ কোটি এক লাখ ১৫ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া সড়ক মজবুতীকরণ (সারফের্সিংসহ) খাতের পরিমাণ ০.৭৯ কমলেও ব্যয় এক কোটি ৪৭ লাখ ১৯ হাজার টাকা বৃদ্ধি করে আট কোটি তিন লাখ ৭০ টাকার পরিবর্তে সাড়ে ৯ কোটি টাকার বেশি প্রস্তাব করা হয়েছে।
আর পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের তথ্য হলো, আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণ খাতের পরিমাণ ২৩.৩০ মিটার ও ব্যয় তিন কোটি ৫২ লাখ ২৫ হাজার টাকা কমেছে। এখন ব্যয় ১৭.৪০ কোটি টাকার পরিবর্তে প্রায় ১৪ কোটি টাকায় প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া, বিদ্যমান বেইলি সেতু অপসারণ অঙ্গের পরিমাণ ২০.৮৭ মিটার ও ব্যয় ১৫.৩৭ লাখ টাকা বৃদ্ধি করে এক কোটি ২০ লাখ ৩০ হাজার টাকার পরিবর্তে এক কোটি ৩৫ লাখ ৬৭ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্ধিত মেয়াদে প্রকল্পটি শেষ হবে কি এমন প্রশ্নে রংপুর সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর তথ্য হলো, ভূমি অধিগ্রহণের জমি বুঝে পাওয়া এবং নতুন পুনর্বিন্যাসকৃত ডব্লিউপি-১০এ প্যাকেজটি সমাপ্ত করাসহ অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত দুই বছর সময় প্রয়োজন।
পরিকল্পনা কমিশন যা বলছে:
ভৌত অবকাঠামো বিভাগ বলছে, প্রায় পাঁচ বছর যাবৎ চলমান প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে গৃহীত প্রকল্পটির একাধিকবার মেয়াদ বৃদ্ধিসহ সংশোধনের ও ডিজাইন পরিবর্তন যৌক্তিক নয়।



