আযাদ আলাউদ্দীন বরিশাল ব্যুরো
এক সময় যে ভবন থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো বরিশাল জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, যেখানে নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকতো দিন-রাত, এখন সেই ভবন দাঁড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত ও নীরব এক ধ্বংসস্তূপ হিসেবে।
বরিশাল নগরীর বিবিরপুকুর পাড়ে সোহেল চত্বরে সিটি করপোরেশনের একটি ভবনের নিচতলায় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অবৈধভাবে স্থাপন করা হয় জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ কার্যালয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিন ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। সেদিন ভবনটির নিচতলায় অবস্থিত আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আগুন লাগানো হলেও পুড়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় পুরো ভবন। সেই ভবনটি এখন মাদকসেবী ও নেশাখোরদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। একই সাথে ভবনের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার হচ্ছে উন্মুক্ত টয়লেট হিসেবে।
সরেজমিন দেখা যায়, ভবনের প্রধান ফটক ও দেয়ালের বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। আগুনের কালো দাগ এখনো স্পষ্ট। ভেতরের বেশির ভাগ কক্ষ পরিত্যক্ত। কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা, আবার কোথাও দুর্গন্ধে দাঁড়িয়ে থাকাই কষ্টকর। ভবনের আশপাশেও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত থাকায় ভবনটি এখন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদ আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ভবনের বিভিন্ন কক্ষে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। অনেকেই সেখানে গাঁজা ও অন্যান্য মাদক সেবন করেন। ফলে আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো: রাজু বলেন, এক সময় এখানে নেতাকর্মীদের ভিড় ছিল। এখন ভবনের অবস্থা খুবই খারাপ। সন্ধ্যার পর অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা বাড়ে। অনেকেই এখানে মাদকসেবন করে। আরেক বাসিন্দা মালেক বলেন, ভবনটি এখন কার্যত পাবলিক টয়লেটে পরিণত হয়েছে। দুর্গন্ধের কারণে আশপাশ দিয়ে চলাচল করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
জানা যায়, বরিশাল সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন এই এনএক্স ভবনের নিচতলা থেকেই দীর্ঘদিন জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, দলীয় বৈঠক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র ছিল এই কার্যালয়।
সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর সময় ভবনটি আধুনিকায়ন করা হয়। নতুন অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করে এটিকে আরো কার্যকর কার্যালয়ে রূপ দেয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ভবনটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আগুনে পুড়ে যায় ভবনের বিভিন্ন অংশ। ভেঙে ফেলা হয় আসবাবপত্র ও অভ্যন্তরীণ স্থাপনা। এরপর থেকে কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে ভবনটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভবনটির কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এতটাই বেশি যে এটি পুনঃসংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করা কঠিন। ফলে ভবিষ্যতে ভবনটির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
এক সময় জেলার রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই ভবন আজ সময়ের নির্মম বাস্তবতার নীরব সাক্ষী। যেখানে একসময় রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ হতো, সেখানে এখন ভেসে আসে শুধুই পরিত্যক্ততার গন্ধ।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, ছাত্র জনতার হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে সিটি করপোরেশনের এই পুরো ভবনটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আপাতত এটি সংস্কারের কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে ভবনটি পুনঃনির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।



