- জ্বালানির মূল্য বাড়লেও মূল্যস্ফীতি বাড়বে না
- জ্বালানির অস্থিরতা প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার প্রস্তুত
- বিশ্বের ২১ দেশে ২৪টি বাণিজ্যিক উইং কাজ করছে
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর সংসদকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সাথে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের সাথে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৭.৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ব্যতীত অন্যান্য দেশের সাথেও বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।
গতকাল সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে ঢাকা-১৮ আসনের এমপি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি ও রফতানির তথ্যানুযায়ী সার্কভুক্ত দেশ আফগানিস্তান, ভুটান, ভারত ও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে আফগানিস্তানে ১০.৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ভুটান ২৯.৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, পাকিস্তান ৬৮১.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৭.৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
জ্বালানির অস্থিরতা প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার প্রস্তুত
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর। তিনি বলেন, এই অস্থিরতা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখলেও মূল্যস্ফীতি সেইভাবে বাড়বে না এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো: শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের লিখিত জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী আরো বলেন, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে এবং বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রফতানি বাজার, যেখানে তৈরী পোশাক, ঔষধ, হিমায়িত খাদ্য ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি হয়ে থাকে।
তিনি জানান, চলমান অস্থিরতার কারণে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয়, শিপিং ও বীমা খরচ বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি হ্রাস, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সরকার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
রফতানি বহুমুখীকরণে জোর
বাণিজ্যমন্ত্রী সংসদকে জানান, সঙ্কট মোকাবেলায় ভারত, নেপাল, ভুটানসহ পূর্ব এশিয়া ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে রফতানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, কৃষিজ ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, প্লাস্টিক, হিমায়িত খাদ্য, চিংড়ি ও মৎস্য, আইসিটি এবং হালকা প্রকৌশল খাতে রফতানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া জাহাজ শিল্প ও পাদুকা খাতে কাঁচামাল আমদানিতে ফ্রি অব কস্ট সুবিধা দেয়া হয়েছে। রফতানিকারকদের জন্য অনলাইনে রুলস অব অরিজিন সনদ প্রদান করা হচ্ছে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদারে বিভিন্ন দেশের সাথে নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর জানান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে সিইপিএ এবং বিভিন্ন দেশের সাথে এফটিএ আলোচনায় বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে। নেপালের সাথে প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের তিন দফা আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং পরবর্তী ধাপের জন্য যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
ভুটানের সাথে বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদারে ঢাকায় বাণিজ্য সচিবপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং জয়েন্ট ট্রেড কমিটির সভা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া জাপানের সাথে ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা কার্যকর হলে এটি বাংলাদেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হবে।
জ্বালানির মূল্য বাড়লেও মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে না
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জ্বালানির মূল্য বাড়লেও মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে না। তিনি ব্যাখ্যা করেন, বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানির দাম ‘মডেস্ট’ হারে বাড়ানো হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা করা হয়েছে, যা ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি। কিন্তু একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মোট উৎপাদন খরচের মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ জ্বালানি ব্যয় হওয়ায় এর প্রভাব সীমিত থাকবে।
পরিবহন খরচের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ২০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে একটি বাসে প্রায় ৩০ লিটার ডিজেল লাগে, যার ফলে খরচ বাড়ে প্রায় ৪৫০ টাকা। এই খরচ ১০ হাজার কেজি পণ্যের ওপর ভাগ হলে প্রতি ইউনিটে প্রভাব খুবই কম পড়ে। ফলে এটি মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর মতো বড় কোনো উপাদান নয়।
লজিস্টিকস ব্যয় কমানোর উদ্যোগ
শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দেশের লজিস্টিকস খরচ বর্তমানে জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যা বিশ্ব গড়ের তুলনায় বেশি। এ খরচ কমাতে বন্দরগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট খাত উন্নয়নে কাজ করছে সরকার। তিনি বলেন, বাহ্যিক ধাক্কা যেন অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে জোর দেয়া হচ্ছে।
জ্বালানি সাশ্রয় ও বাজার তদারকি
সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধে শপিংমল, মার্কেট, দোকান, বিলবোর্ড ও বাণিজ্য মেলা সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। একই সাথে অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো এবং সরকারি ব্যয় সঙ্কোচনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
অসাধু মজুদদারি ও কৃত্রিম সঙ্কট প্রতিরোধে বাজার তদারকি জোরদার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চীন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সাথে সমন্বয় বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ
সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বিশ্বের ২১টি দেশে বাংলাদেশের ২৪টি বাণিজ্যিক উইং কাজ করছে, যা রফতানি সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের সাথে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টের মাধ্যমে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমিয়ে রফতানি বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে সরকার প্রস্তুত রয়েছে।
ভারত ও রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ : রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেছেন, জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলার উদ্দেশ্যে সরকার ভারত, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। একইসাথে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য আমদানি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের রফতানি বাজার সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করে বাংলাদেশের আমদানি রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার প্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র, অর্থনৈতিক জোট ও অঞ্চলের সাথে দ্বিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয় পর্যায়ে কৌশলগত ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (এফটিএ) গঠনে অগ্রাধিকার দিয়েছে।



