জাহাঙ্গীর আলম হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ)
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ২৫০ বছরের পুরনো দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক গোল মসজিদ। কয়েক দফা সংস্কারের ফলে নতুন রূপে এটি উপজেলার শাহেদল ইউনিয়নের বাগপাড়া গ্রামে মোগল আমলের স্মৃতি বহন করে চলেছে। মূলত অজপাড়াগাঁয়ে স্থাপিত ঐতিহাসিক ওই গোল মসজিদটি সে সময়ে হোসেনপুর উপজেলাসহ আশপাশের এলাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচারের একমাত্র ধারক ও বাহক হিসেবে ব্যবহার হতো।
মসজিদ প্রাঙ্গণে স্থাপিত প্রাপ্ত শিলালিপি ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, হোসেনপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে ঐতিহ্যবাহী গলাচিপা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নিকটবর্তী ওই গোল মসজিদটি ঐতিহাসিক মোগল আমলের নজরকাড়া স্থাপত্য শিল্পে নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তীতে হিজরি ১২১৯ সালের দিকে এটি প্রথম পুনঃনির্মাণ করা হয়।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের ভাষ্য মতে, সুদূর ইরাক থেকে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ পূর্ব বাংলায় মুসলিম ধর্মযাজক শেখ মুহাম্মদ শামছুদ্দিন ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য তৎকালীন কিশোরগঞ্জের অন্তর্গত হোসেনশাহী পরগনার আওতাধীন হোসেনপুর উপজেলার শাহেদলের বাগপাড়া গ্রামে বসতি স্থাপন শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে শেখ শামছুদ্দিনের দুই ছেলে মো: শেখ আদম ও মো: শেখ আলম ওই বাগপাড়া এলাকায় ঐতিহাসিক গোল মসজিদটির অবশিষ্ট নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। আজও স্বমহিমায় স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।
সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহকালে মসজিদ প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, মসজিদটির দেয়াল তিন ফুট প্রস্থ। উপরের ছাদের অংশ সম্পূর্ণ গোলাকার আকৃতির। চুন, ইট ও আখের লালির সংমিশ্রণে দেয়ালের গাঁথুনি সম্পন্ন করা হয়েছে। ওই গোল মসজিদের আয়তন কম হওয়ায় ইমামসহ তিন কাতারে ১৫-২০ জন মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন।
স্থানীয় প্রবীণ মুসল্লি মো: রবি হোসেন, মসজিদটি দেখতে আসা হোসেনপুর আদর্শ মহিলা ডিগ্রি (অনার্স) কলেজের অধ্যাপক আবদুল ওয়াদুদ, এস এম আবুল মোমেন ও মো: কফিল উদ্দিন, মো: নবী হোসেনসহ অনেকেই জানান, ঐতিহাসিক এ গোল মসজিদের বয়স আনুমানিক ২৫০ বছরেরও বেশি হবে। উপজেলার শাহেদল ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মো: ফিরোজ উদ্দিন জানান, বর্তমানে মসজিদটিতে মুসল্লিদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এলাকাবাসীর উদ্যোগে কয়েক বছর আগে ওই গোল মসজিদটি ফের সম্প্রসারণ ও সংস্কার কাজের পাশাপাশি মসজিদের ভেতরে টাইলস ও চারপাশে রঙ করে দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে। ফলে নতুন রূপ লাভ করেছে ঐতিহাসিক মসজিদটি।
স্থানীয় লেখক ও গবেষক অধ্যাপক এ বি এম ছিদ্দিক চঞ্চল জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি শিক্ষক ও সহপাঠীদের সাথে ওই গোল মসজিদটি পরিদর্শন করেছিলেন। পরে কর্মজীবনে প্রবেশ করে ওই গোল মসজিদের পরিচিতি শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট ছিলেন। তবে ঐতিহাসিক এ গোল মসজিদটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে আরো ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
এ ব্যাপারে উপজেলার শাহেদল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জিএস আবুল হাসিম সবুজ জানান, সম্প্রতি নতুন করে সংস্কারের ফলে ঐতিহাসিক এ গোল মসজিদটির নান্দনিকতা ফুটে উঠেছে। ফলে এটি তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্টের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গবেষণা কাজেও সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তাই দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতির জন্য এ গোল মসজিদটি দেশের প্রতœতাত্ত্বিক বিভাগের নিয়ন্ত্রণে অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানান তিনি।


