এ বছর তাপমাত্রা আগের রেকর্ড ভাঙতে পারে

দেশে সবচেয়ে বেশি গরম থাকে এপ্রিল মাসে। এর গড় তাপমাত্রা ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর মে মাস হলো দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উষ্ণ মাস। এ সময় গড় তাপমাত্রা থাকে ৩২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু বিগত কয়েক বছর থেকে তা তার রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা এবারো হতে পারে।

আবুল কালাম
Printed Edition

এপ্রিলের শুরুতেই অসহনীয় তাপমাত্রা সামনের সময়ের জন্য কঠিন বার্তা দিচ্ছে। বলা হচ্ছে বিগত বছরের মতো এবারো রেকর্ড তাপমাত্রা হতে পারে। সৃষ্টি করতে পারে নতুন রেকর্ড।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সবচেয়ে বেশি গরম থাকে এপ্রিল মাসে। এর গড় তাপমাত্রা ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর মে মাস হলো দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উষ্ণ মাস। এ সময় গড় তাপমাত্রা থাকে ৩২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু বিগত কয়েক বছর থেকে তা তার রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা এবারো হতে পারে।

বেসরকারি গবেষণা বলছে, সামনের চার বছরের মধ্যে ৪৫ ডিগ্রি এবং ২৫ বছরে গরমের মাত্রা ৪৬ ডিগ্রি ছাড়াবে। আর ৩৪ সালের দিকে আরেকটি চরম তাপপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে। ১৯৯৫ সালের পয়লা মে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৪৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর পর বিগত কয়েক বছর ধরে বিরাজ করছে অসহনীয় তাপমাত্রা। যার ধারাবাহিকতায় বিগত বছরে তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি অতিক্রম করেছে।

বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১৮ মে রাজশাহীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রিকর্ড ছিল ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা ২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছিল শীর্ষ। তাদের মতে, ঘূর্ণিঝড় এবং বন্যার সাথে উষ্ণতা বৃদ্ধির সম্পর্ক আছে। উষ্ণায়নের কারণে জলবায়ু ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে। এতে নানা ধরনের দুর্যোগ বেড়ে যায়। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বে জলবায়ুর স্বাভাবিক আচরণের পরিবর্তন ঘটেছে।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এসডো বলছে আগামীতে বাংলাদেশের তাপমাত্রা দৈনিক গড় উষ্ণায়নের চেয়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাড়বে।

প্রতিষ্ঠানটি তাদের গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরে জানায়, গত প্রায় চার যুগে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই গড় তাপমাত্রা আরো দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে বিগত সময়ের সব রেকর্ড ৪৫ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাবে।

প্রতিবেদনে ৩৪ সালের দিকে আরেকটি বড় তাপপ্রবাহের আশঙ্কা করে বলা হয়, তাপদাহের কারণে গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে তাপমাত্রা বেড়েছে। এ জন্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ুর পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানি ও শিল্পকারখানা থেকে কার্বন নির্গমন বৃদ্ধি ও জলবায়ুর ওপর সমুদ্রের প্রভাবকে দায়ী করা হয়।

তাপদাহের প্রভাব তুলে ধরে এতে বলা হয়, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশে হিটস্ট্রোক এবং শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। সে সাথে বিগত কয়েক বছর থেকে এখন হাসপাতালে ভর্তি ও মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে ২০৩০ সালে এই তাপপ্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে উল্লেখ করে বলা হয় বয়স্কদের মধ্যে তাপদাহজনিত কারণে ২০৮০ সালের মধ্যে প্রতি এক লাখে ৩০ জনের মৃত্যু হতে পারে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান দায়ী মন্তব্য করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর বাইরে আরো একাধিক কারণ রয়েছে যার অন্যতম জলবায়ুর পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানি ও শিল্পকারখানা থেকে কার্বন নির্গমন বৃদ্ধি, যা গ্রিনহাউজ গ্যাস বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, জলবায়ুর ওপর সমুদ্রের প্রভাব, সবুজায়ন ধ্বংস, নদী, পুকুর খাল বিল ও জলাশয় ভরাট করে ভবন নির্মাণ। এর ফলে গত ৫০ বছর ধরে দেশে তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে। যা আগামী চার বছরের মধ্যে আরো দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে।

মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. মোহাম্মদ আবদুর রব নয়া দিগন্তকে বলেন, মানুষের হস্তক্ষেপের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনে পৃথিবী বদলে যাচ্ছে। বাড়ছে সুমদ্রের উচ্চতা। নষ্ট হচ্ছে ইকো সিস্টেম। হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। জলাভূমি হচ্ছে মরুভূমি। জলবায়ু প্রভাবে ভয়াবহ বন্যার সাথে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এখন যখন তখন ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মৃত্যু বাড়ছে।

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমাদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, যে কয়েকটি কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে তার অন্যতম হলো সবুজায়ন ধ্বংস, নদী, পুকুর খাল বিল ও জলাশয় কমে আসা ছাড়াও বৈশি^ক, আঞ্চলিক ও স্থানীয় কারণ। বন উজাড় করায় বৃক্ষ কমে গিয়ে এখন অক্সিজেন, জলীয়বাষ্প কমে গিয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের চেয়ারপারসন ও সাবেক সচিব সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ বলেন, যদি তাপদাহের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে তবে ভবিষ্যতে তাপমাত্রা আমাদের জন্য অসহনীয় হবে। এর নিয়ন্ত্রণে অন্যতম উপায় গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমানোর মাধ্যমে তাপপ্রবাহ প্রবণতা কমানো।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এলনিনোর প্রভাবে সারা পৃথিবীতে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। তার মতে, এভাবে উচ্চ তাপমাত্রা অব্যাহত থাকলে গাছপালা বিলীন এবং শস্য আবাদে চরম ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যত দ্রুত সম্ভব এর মোকাবেলায় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।