গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি

কোরবানির পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় যশোরের খামারিরা

Printed Edition

এম আইউব যশোর অফিস

আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে যশোরের খামারিদের ব্যস্ততা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তবে পশু লালনপালনে বাড়তি খরচ ও বাজারে ন্যায্য দাম না পাওয়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তাও বাড়ছে তাদের। খামারিদের অভিযোগ, গবাদিপশুর খাদ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় এবার গরু মোটাতাজাকরণে খরচ অনেক বেশি হয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে কোরবানির পশুর দাম মিলবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।

যশোর সদর উপজেলার কাজীপুর গ্রামের লিমা খাতুন প্রতি বছরই ছোট পরিসরে গরু পালন করেন। এবার তিনি চারটি গরু লালনপালন করেছেন। এর মধ্যে দু’টি এঁড়ে গরু কোরবানির বাজারে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করছেন। তিনি জানান, গরুকে ঘাস ও বিচালির পাশাপাশি খৈল, ভুসি ও দানাদার খাবার খাওয়াতে হয়। এসব খাদ্য চড়া দামে কিনতে হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। লিমা বলেন, ‘সারা বছর যত্ন করে গরু বড় করেছি। কিন্তু বাজারে যদি ভালো দাম না পাই, তাহলে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হয় কি না কে জানে।’

একই গ্রামের খামারি সোলাইমান হোসেন জানান, প্রতি বছর কোরবানিকে কেন্দ্র করে তিনি পাঁচ থেকে সাতটি গরু মোটাতাজা করতেন। তবে গত কয়েক বছরে কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় এবার মাত্র দু’টি গরু প্রস্তুত করেছেন। তিনি বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে অনেক সময় কম দামে গরু বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়। কসাই ও ব্যবসায়ীদের একটি চক্র বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এতে আমাদের মতো ছোট খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লোকসানের কারণে অনেকেই এখন গরু মোটাতাজাকরণ কমিয়ে দিয়েছে।’

প্রান্তিক খামারিদের পাশাপাশি সাধারণ কৃষকরাও একই ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করছেন। কাজীপুর গ্রামের কৃষক মোসলেম উদ্দিন বলেন, কোরবানির মৌসুম এলেই পশুখাদ্যের দাম বেড়ে যায়। এতে গরু পালন ও মোটাতাজাকরণে অতিরিক্ত খরচ হয়। কিন্তু বিক্রির সময় অনেক ক্ষেত্রে সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যায় না। তার ভাষ্য, ‘কোরবানির আগে কিছু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পশুর দাম কমিয়ে দেয়। বাধ্য হয়ে তখন লোকসানে গরু বিক্রি করতে হয়। এ কারণে গ্রামের অনেক মানুষ এখন আর আগের মতো গরু মোটাতাজা করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে না।’

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে যশোরে ১৩ হাজার ৬৪০টি গবাদিপশুর খামার রয়েছে। এসব খামারে এবার এক লাখ ১৭ হাজার ৯৯৭টি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৮ হাজার ৮৪৪টি ষাঁড়, ৯৫৭টি বলদ, ছয় হাজার ৪৫৮টি গাভী, ৮১ হাজার ২৭৬টি ছাগল ও ৪৪২টি ভেড়া।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, জেলায় এ বছর কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে এক লাখ তিন হাজার ১২৮টি। সেই হিসাবে চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।

যশোরের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: সিদ্দিকুর রহমান বলেন, কোরবানিকে সামনে রেখে খামারিদের নিরাপদ ও প্রাকৃতিক উপায়ে পশু মোটাতাজাকরণের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যশোরের পশু সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং কোরবানি করার উপযোগী।

তিনি আরো বলেন, ‘খামারিরা খাদ্যের দাম বেশির বিষয়টি আমাদের জানিয়েছেন। আমরা তাদের পরামর্শ দিয়েছি, শুধু দানাদার খাবারের ওপর নির্ভর না করে কাঁচা ঘাসের ব্যবহার বাড়াতে। এতে উৎপাদন খরচ কিছুটা কমানো সম্ভব।’

ভারতীয় গরু যাতে সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সেই দাবিও খামারিদের মধ্যে রয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও খামারিদের আশ্বস্ত করা হয়েছে।

তবে সব মিলিয়ে এবারো কোরবানির বাজারে লাভ-লোকসানের হিসেব নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না যশোরের খামারিদের। সারা বছরের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবেন কি না, এখন সেই অপেক্ষায় তারা।