পদ্মা ও তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ করবে সরকার : প্রধানমন্ত্রী

Printed Edition
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গাজীপুরের সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর সাইক্লিং দলের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন  : পিআইডি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গাজীপুরের সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার বাহিনীর সাইক্লিং দলের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন : পিআইডি

গাজীপুর মহানগর প্রতিনিধি

বর্তমান সরকার পদ্মা ব্যারাজের পাশাপাশি তিস্তা ব্যারাজও নির্মাণ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার বিকেলে গাজীপুরে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে তিনি এ ঘোষণা দেন। এর আগে তিনি এই ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের সবার সামনে আজকে আমি পরিষ্কার একটি কথা বলে যাই, ইনশা আল্লাহ এই বিএনপি সরকার পদ্মা ব্যারাজের কাজে হাত দেবে। ইনশা আল্লাহ তিস্তা ব্যারাজের কাজেও হাত দেবে।’

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা বড় বড় কথা বলছে, তাদের উদ্দেশে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই আজকে এখানে দুর্যোগমন্ত্রী (আসাদুল হাবিব দুলু) বসে আছেন, এই লোকটার নেতৃত্বেই তিস্তায় বিএনপি কর্মসূচি পালন করেছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করেনি। তারা হয়তো গরম কথা বলেছে; কিন্তু কাজ যদি কেউ করে থাকে, পরিস্থিতি যদি কেউ তৈরি করে থাকে, সেটি বিএনপিই করেছে এবং ইনশা আল্লাহ বিএনপিই সেটি করবে।’

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে ব্যারাজ তৈরি করে বিভিন্নভাবে পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এর ফলে শুষ্ক মৌসুমে আমরা কম পানি পাচ্ছি। নদীতে স্রোত কমে যাওয়ায় আশপাশ শুকিয়ে যাচ্ছে। একসময় পদ্মা নদীর এপার থেকে ওপার দেখা যেত না, এখন তা পানিশূন্য।’

তিনি আরো বলেন, ‘ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রের নোনা পানি ঢুকছে। এর ফলে সুন্দরবনসহ ওই অঞ্চলের গাছপালা নষ্ট হচ্ছে এবং বিভিন্ন বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে এবং শুষ্ক মৌসুমে মানুষকে পানি সরবরাহ করতে আমাদের ব্যারাজ নির্মাণ করে বর্ষার বাড়তি পানি ধরে রাখতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস মেনে নেয়া যায় না। বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভূমিকম্প, বন্যা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে আবাসন সঙ্কট বাড়ছে। শুধু ভবন নির্মাণ করলেই হবে না, সেখানে স্কুল-কলেজ, হাসপাতালসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে।’

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের আবহাওয়া দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখনকার আবহাওয়া আর এখনকার আবহাওয়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের জন্য মানুষও অনেকাংশে দায়ী।’

উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংসের সমালোচনা করে তিনি জানান, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ এলাকায় রাস্তা নির্মাণে গাছ কাটার পরিকল্পনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে বিকল্প নকশা প্রণয়নের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ‘উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ক্ষতি মেনে নেয়া যায় না,’ বলেন তিনি।

ভূগর্ভের পানির অপচয় রোধ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার খাল খনন ও নদীতীরবর্তী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে গবেষণানির্ভর আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন এখন সময়ের দাবি। নতুন এই প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট দুর্যোগ মোকাবেলায় দক্ষ জনবল তৈরিতে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাতাইশ মৌজায় প্রায় ৮ দশমিক ২০ একর জমিতে নির্মিতব্য এ ইনস্টিটিউটে প্রশাসনিক-কাম-অ্যাকাডেমিক ভবন, আবাসিক হোস্টেলসহ আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা থাকবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ নিয়ে গবেষণা এবং দক্ষ জনবল তৈরিই হবে প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। এ ছাড়া বক্তব্য দেন- মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: সাইদুর রহমান খান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান।

আনসার বাহিনী হবে দক্ষ জনশক্তির বড় শক্তি : এর আগে সকালে সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার ভিডিপি একাডেমিতে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেন, আনসার বাহিনী শুধু নিরাপত্তা রক্ষাতেই নয়, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তিনি বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বন্দর ও পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তায় আনসার সদস্যরা দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করছেন। অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি দুর্যোগকালেও তারা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

তিনি বলেন, সঞ্জীবন প্রকল্প, বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও আনসার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের মাধ্যমে বাহিনীটি দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করছে। ভবিষ্যতে আনসার বাহিনী আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী ইয়াদ আলী প্যারেড গ্রাউন্ডে আনসার সদস্যদের কুচকাওয়াজ ও মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদর্শনী উপভোগ করেন। পরে তিনি দেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মরত আনসার সদস্যদের সমস্যার খোঁজখবর নেন।

দুই অনুষ্ঠানেই স্থানীয় সংসদ সদস্য, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুধীজন ও বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া টঙ্গীর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করীম রনি, গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইয়ুবী, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: শওকত হোসেন সরকার, সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ মো: হাসান উদ্দিন সরকার, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মো: শরাফ উদ্দিন, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো: নূরুল করিম ভূঁইয়া, জিএমপি কমিশনার মো: ইসরাইল হাওলাদার প্রমুখ।