নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি ও ফতুল্লা সংবাদদাতা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ইতোমধ্যে সরকার অনেক অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর নিয়োগ, ইসলামী ব্যাংকের দিকে কালো হাত, বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় ভিসি নিয়োগ, জেলা পরিষদের মত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দলীয় নেতা ও ক্যাডার নিয়োগ দিয়ে এভাবেই একদলীয় শাসন বাংলাদেশে কায়েম করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শেখ মুজিবুর রহমানও একদলীয় শাসন কায়েম করেছিল, টিকতে পারেনি।
গতকাল শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে মহানগর জামায়াতে ইসলামীর কর্মী সম্মেলনে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুল জব্বারের সভাপতিত্বে সম্মেলনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুল জব্বার এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেন।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের এমপি সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩), সহকারী সেক্রেটারি ও ঢাকা-৫ এর এমপি মোহাম্মদ কামাল হোসেন, ঢাকা জেলার আমির মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মঈনুদ্দিন আহমাদ এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা আমির মো: মমিনুল হক সরকার।
জামায়াত আমির বলেন, ’২৪ হয়েছিল বলেই ’২৬ সালের নির্বাচন হয়েছে। ২৪ না হলে ২৬ সালে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল না। তাদের রক্তের বিনিয়েই আমরা সরকারি ও বিরোধীদল হয়েছি। আমি অনুরোধ করব এ শহীদদের কেউ যেন খাটো করে না দেখেন। তিনি বলেন, আমি গভীর কৃতজ্ঞতা জানাই ১৯৪৭, ’৫২ ও ’৭১সহ বিভিন্ন সময় যারা বুক চিতিয়ে সংগ্রাম করেছেন, ২০২৪ সালে যারা শহীদ হয়েছেন আমি সেসকল শহীদ পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বিগত নির্বাচনে হাজারও জালিয়াতি, সন্ত্রাস ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরে আপনারা ১১ দলীয় জোটকে একটি আসন উপহার দিতে পেরেছিলেন। ভোটের মত রেজাল্ট গণনা সুষ্ঠু হলে অন্য আসনেও জোটের বিজয় হতো।
জামায়াত আমির বলেন, অনেকের আমাদের ওপর অভিমান এ রায় কেন মেনে নিলেন। আমরা বলেছি ১৭ বছর দেশ ছিল স্বৈরাচারের কবলে। মানুষ তো ভোট দিয়েছে। নির্বাচনের আগে সব জায়গায় একই আওয়াজ উঠেছিল, দাঁড়িপাল্লা। একই দিনে দু’টি ভোট হয়েছিল। আমাদের অবস্থান সুদৃঢ় ছিল। আমাদের মার্কা ও গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে। বর্তমান সরকার প্রথমে হ্যাঁ এর পক্ষে ছিল না। তারা গোপনে না এর পক্ষে ছিল। পরে জনরোষের মুখে রংপুরে আবু সাঈদের এলাকায় গিয়ে তিনি (তারেক রহমান) বলেছিলেন হ্যাঁ ভোট দিতে। তিনি তো সংসদের নেতা। এই গণভোটে ৬৭ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে। তার মন্ত্রী বলেছে ভোটটা যাতে হয়ে যায় এজন্য হ্যাঁ ভোট চেয়েছে। এগুলো করলে জনগণের রাজনীতিবিদদের প্রতি সম্মান কিভাবে থাকবে।
তিনি বলেন, যেহেতু প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ হ্যাঁ-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে সব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হবে। এখন সময় আছে ফিরে আসুন, জনগণের রায় বাস্তবায়ন করুন। নয়তো জনগণ আপনাদের সামনে হিমালয় পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। ডা: শফিক বলেন, সরকার গঠনের আগে ও পরে আপনারা চাঁদাবাজদের হাত আটকাতে পারেননি। ঘুষ দুর্নীতি বন্ধ করেননি বরং তার মিটার আগের থেকে বেড়ে গেছে। কিছু দলকানা মানুষ ও গোষ্ঠীর হয়তো ভাগ্য পরিবর্তন হবে। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না।
জামায়াত আমির বলেন, এ নারায়ণগঞ্জ একসময় প্রাচ্যের ড্যান্ডি ছিল। নারায়ণগঞ্জ তার গৌরব হারিয়ে ফেলেছে। এটা সন্ত্রাসের নগরী হিসেবে পরিণত হয়েছিল। ত্বকী আপনাদের সন্তান, তার হত্যার বিচার কী পেয়েছেন? একজন নেতা ছিল, বলত খেলা হবে। এখন কোথায় খেলছে? অহঙ্কার ভালো নয়। নতুন কোনো গডফাদার এখানে তৈরি হোক আমরা চাই না। জামায়াত আমির বলেন, আমি এখানে আসার আগে ব্যবসায়ী বন্ধুদের সাথে বসলাম। কী যেন আতঙ্ক তাদের তাড়া করছে। তারা কথা বলতে পারছে না। একজন বলেই ফেললেন আমরা ভালো নেই। চাঁদাবাজরা আমাদের ভালো থাকতে দিচ্ছে না। দলের নেতা বলে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে। আর ঘরে ঘরে চাঁদাবাজদের পৌঁছে দিয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা চাই না আমাদের প্রিয় নারায়ণগঞ্জ অশান্তি ও চাঁদাবাজদের কবলে পড়ে থাকুক। ড্রেনের পানি দিয়ে যেমন অজু হবে না তেমনি ভালো মানুষ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন হবে না। ভালো মানুষ ছাড়া কী এ নগর গড়া যাবে? এমন মানুষ লাগবে যে আল্লাহকে ভয় করে। এমন মানুষ ছাড়া কী আমরা নিরাপদ নারায়ণগঞ্জ গড়তে পারব? আমরা সৎ নেতৃত্ব কায়েম করব জনগণকে তার অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে। আমাদের দাবি সব অনির্বাচিত প্রশাসক সরিয়ে দ্রুত নির্বাচন দেয়া হোক। নারায়ণগঞ্জ মহানগরীতে অনির্বাচিত প্রশাসক সরিয়ে দিয়ে অনতিবিলম্বে নির্বাচন দেয়া হোক। আগামী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এখানে প্রার্থী দিবে। আমি আপনাদের নেতা আব্দুল জব্বারকে এখানে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করছি। ২৭টি ওয়ার্ডের প্রতিটি ওয়ার্ডে আমরা জনগণের সেবা করতে পারে এমন প্রার্থী আমরা উপহার দিবো।
জামায়াত আমির আরো বলেন, ‘সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার এই সংস্কৃতি চালু করেছিল আওয়ামী লীগ। সবচেয়ে বেশি গালি দিতো বিএনপিকে। সাথে সাথে আমাদেরও একটু রাখত, ছাড় দিত না। এখন বিএনপিও ওই পুরনো আওয়ামী লীগ যা বলত, সেই পুরনো আমলের কথাগুলো এখন তারাও জপা শুরু করেছে। যে কথাগুলো জপতে জপতে আওয়ামী লীগ গিয়ে পড়েছে দিল্লিতে, আপনারা সেই কথাগুলো জপতে জপতে কোথায় গিয়ে পড়বেন?’
‘জনগণ এগুলো খায় না! তরুণ-যুব সমাজ এগুলো শুনতে চায় না। তরুণ-যুব সমাজের মুখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন, না হলে ভুল করবে। আমরা আশা করতে চাই, সরকার নিজেদের ভুল নীতি পরিহার করে জনকল্যাণমূলক, জনবান্ধব নীতিতে ফিরে আসবে,’ বলেন তিনি।
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘একটা বড় বাজেট দেয়া হয়েছে। অসুবিধা নাই, বাজেট দেয়ার দায়িত্ব সরকারের, বাস্তবায়ন করার দায়িত্বও সরকারের। শুধু এতটুকু বলব, গত সাড়ে ১৫ বছরে বাজেট থেকে যেভাবে আওয়ামী লীগ আর তার দোসর ২৯ লাখ কোটি টাকা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পথে আপনারা হাঁটবেন না। তবে কিভাবে আস্থা রাখব? কারণ সরকার গঠন করার আগে এবং পরে আপনারা তো চাঁদাবাজদের হাত আটকাতে পারেন নাই! একটা চাঁদাবাজকে আপনারা শাস্তির আওতায় আনেন নাই। ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করেন নাই, বরং তার মিটার আগের থেকে বেড়ে গেছে। যদি এই অবস্থা জারি থাকে, তাহলে জনগণ জনগণের জায়গায় তার ভাগ্য নিয়ে হুমড়ি খাবে। আর কিছু দল, দলকানা কিছু মানুষ এবং কিছু গোষ্ঠীর হয়তো ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। বাংলাদেশ আর এটা দেখতে চায় না।’
মুন্সীগঞ্জে রুকন সম্মেলনে অংশগ্রহণ
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন-সংগ্রাম ও শহীদদের আত্মত্যাগের কারণেই দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। সেই আত্মত্যাগের বিনিময়েই নতুন রাজনৈতিক বিন্যাস ও অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গতকাল বিকেলে মুন্সীগঞ্জ শহরের রয়েল পার্টি সেন্টারে জামায়াতে ইসলামীর মুন্সীগঞ্জ জেলা শাখা আয়োজিত বার্ষিক সদস্য (রুকন) সম্মেলন-২০২৬ এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা জামায়াতের আমির আ জ ম রুহুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে এবং জেলা সেক্রেটারি ফখরুদ্দিন রাজির পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন সংগঠনের দক্ষিণাঞ্চলের পরিচালক ও সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৪৭, ১৯৫২ ও ১৯৭১ সালের মতোই ২০২৪ সালেও অনেক মানুষ জীবন দিয়েছেন। যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি জাতির গভীর কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত। কোনোভাবেই তাদের অবদানকে ছোট করে দেখা যাবে না। তিনি দাবি করেন, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাই জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়ে সব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা উচিত। অন্যথায় জনগণের রায় উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জবাবদিহির সঙ্কট তৈরি হবে।



