সৌদি-পাকিস্তান কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দিচ্ছে তুরস্ক-কাতার

চুক্তির ফলে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত

Printed Edition

এএনআই

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যকার কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে এবার তুরস্ক ও কাতারও যোগ দিতে পারে। বিষয়টি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন।

সোমবার রাতে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফ বলেন, কাতার ও তুরস্ক যদি এই বিদ্যমান চুক্তিতে অংশ নেয়, তবে তা হবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ২০২৫ সালে ইসলামাবাদ ও রিয়াদ যে ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ সই করেছিল, তাতে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ-৫ এর আদলে একটি বিশেষ ধারা রয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী, জোটের যেকোনো এক সদস্যের ওপর আক্রমণ মানেই সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত এই সম্প্রসারিত জোটে সৌদি আরব ও কাতারের অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক অভিজ্ঞতা এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা একত্রিত হলে তা একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হবে। এই সম্ভাব্য সামরিক কাঠামোকে বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বা ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরান যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা যথেষ্ট নয়। ফলে দেশগুলোর মধ্যে নতুন মিত্রতা তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি তুরস্ক এই জোটে যুক্ত হলে এর গুরুত্ব ও কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ জানিয়েছেন, এই কাঠামোটি ভবিষ্যতে আরো বিস্তৃত একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে রূপ নিতে পারে, যার লক্ষ্য হবে আঞ্চলিক সহযোগিতা শক্তিশালী করা। গত বছর পাকিস্তান ও সৌদি আরব একটি ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছিল। ওই চুক্তিতে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে, যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণ উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। সৌদি আরব ও পাকিস্তানের এই চুক্তিতে কাতার ও তুরস্কের অন্তর্ভুক্তির ইঙ্গিতকে অনেকেই ‘ইসলামিক ন্যাটো’ গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। বিশ্বজুড়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সঙ্কটের এই সময়ে এমন একটি ধারণা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছে।

খাজা আসিফ বলেন, “জোটের কাজগুলো আংশিক বা পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পন্ন হয়েছে অথবা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটি মূলত ভবিষ্যতের একটি পরিকল্পনা, যার মধ্যে বর্তমান সময়টাও অন্তর্ভুুক্ত রয়েছে”। তিনি যোগ করেন যে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের বিদ্যমান চুক্তিতে কাতার ও তুরস্ক যোগ দিলে তা হবে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। এর ফলে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে এবং বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে। পাকিস্তানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, এই প্রস্তাবিত জোট কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। এর মূল লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি এবং বাইরের দেশগুলোর ওপর থেকে নির্ভরতা হ্রাস করা। আসিফের মতে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ধরনের জোট অত্যন্ত জরুরি।

উল্লেখ্য, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আব্দুল আজিজ আলে সৌদের আমন্ত্রণে রিয়াদ সফরের সময় এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। দুই দেশের ঐতিহাসিক আট দশকের অংশীদারিত্ব এবং ভ্রাতৃত্বের ওপর ভিত্তি করে এই ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সম্পন্ন হয়েছে। এ দিকে সৌদি-পাকিস্তানের এই প্রতিরক্ষা চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই চুক্তির ফলে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ভারত দুই দেশের এই দীর্ঘদিনের ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক রূপদান সম্পর্কে অবগত এবং এর সম্ভাব্য ফলাফলগুলো খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরো জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখাই সরকারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।