মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
মানুষের জীবন নদীর মতো প্রতিশ্রুতির স্রোতে গড়ে ওঠে আস্থা, বিশ্বাস এবং বন্ধনের বাঁধ আমরা একে অপরকে কথা দিই, প্রতিশ্রুতি দিই, আশ্বাস দিই- এরই মধ্য দিয়ে সমাজের বন্ধন হয় দৃঢ় ও মজবুত কিন্তু যখন সেই প্রতিশ্রুতি ফাঁকা বুলিতে রূপান্তরিত হয়, তখন ভেঙে যায় আস্থা, মরে যায় সম্পর্ক, ভস্ম হয়ে যায় বিশ্বাস এই প্রতিশ্রুতি প্রদানের বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ হলো- ‘ইনশাআল্লাহ’ মানে- আল্লাহ চাইলে কত সুন্দর ও পবিত্র একটি শব্দ! এতে লুকিয়ে থাকে বিনয়ের সূর, ঈমানের আলো এবং মানুষের সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তি, এটি বলার মাধ্যমে মানুষ জানায় ‘আমি চেষ্টা করব কিন্তু চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে নয়, আল্লাহর হাতে।’
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকেই আজ এই মহান শব্দটিকে ব্যবহার করছেন মিথ্যা আশ্বাসের প্রতীক হিসেবে। অনেকেই মুখে বলেন ‘ইনশাআল্লাহ করব, ইনশাআল্লাহ দেবো’, ‘ইনশাআল্লাহ যাব’ অথচ অন্তরে থাকে কাজ না করার ইচ্ছা-এ প্রসঙ্গে ইমাম আল আওযায়ি রহ. কড়া সতর্ক করে বলেন, যে ব্যক্তি মনে মনে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইনশাআল্লাহ বলে, সে মিথ্যুক ও বিশ্বাসঘাতক কথাটি যেন বজ্রধ্বনির মতো প্রতিধ্বনিত হয়। কারণ, আল্লাহর নামকে ঢাল বানিয়ে মিথ্যা আশ্বাস দেয়া শুধু প্রতারণাই নয়; বরং এটি কপটতারও নামান্তর। প্রতিশ্রুতির বদলে প্রতারণা এবং আস্থার বদলে অবিশ্বাস সমাজে এমনটি চলতে পারে না সঙ্গত কারণে প্রশ্ন জাগে- আমরা কি সত্যিই ইনশাআল্লাহ-এর মর্যাদা রক্ষা করছি।
ইনশাআল্লাহ কেবল ঠোঁটের ভাষা নয়, এটি অন্তরের অঙ্গীকার, আল্লাহর প্রতি বিনয়, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। এর মর্মার্থ-আমি চেষ্টা করব; কিন্তু সফলতা নির্ভর করছে আল্লাহর ইচ্ছার উপর ইনশাআল্লাহ বলে যদি আন্তরিক চেষ্টা না করা হয়, তবে তা হবে আল্লাহর নামকে ব্যবহার করে মিথ্যা বলার সমতুল্য। কথায় কথায় ইনশাআল্লাহ বলে কাজ না করার প্রবণতা মুমিন হৃদয়ে মুনাফিকির অঙ্কুর বপন করে। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘মুনাফিকের তিনটি বৈশিষ্ট্য হলো- মিথ্যা বলা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা এবং আমানতের খিয়ানত করা।’ - (বুখারি ও মুসলিম)।
ইনশাআল্লাহ বলে যেখানে সত্যের ফুল ফোটার কথা, সেখানে রোপণ করা হচ্ছে মিথ্যার কাঁটা। এখন প্রশ্ন হলো-তাহলে আমাদের করণীয় কী। প্রথমত, সততার সাথে এই শব্দ ব্যবহার করতে হবে। শুধু তখনই ইনশাআল্লাহ বলব, যখন আন্তরিকভাবে চেষ্টা করার ইচ্ছা থাকবে। দ্বিতীয়ত, অসম্ভব প্রতিশ্রুতি দেবো না যদি কাজটি করা না যায়, স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেবো। তৃতীয়ত, ইনশাআল্লাহ বলার পর কাজটি সম্পন্ন করার জন্য আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
আসুন আমরা ইনশাআল্লাহকে ফিরিয়ে আনি তার প্রকৃত মহিমায়- যেন এটি হয় সততা ও আস্থার প্রতীক এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার ঘোষণা। মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সম্পর্ক ভাঙার পরিবর্তে, এই শব্দটি হয়ে উঠুক আস্থা গড়ার সেতু।
লেখক : অনুবাদক ও গবেষক, কাতার প্রবাসী



