নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমাগত বাড়তে থাকা সঙ্ঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পাল্টাপাল্টি হামলার এই বিপজ্জনক চক্র পুরো অঞ্চলে চরম উত্তেজনা ও গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত ৬ জুলাই থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন। জবাবে জর্দান ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান।
ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিমকে হরমুজগান প্রদেশের প্রতিনিধি আহমাদ মোরাদি জানান, গত দুই রাতে দক্ষিণাঞ্চলীয় এই প্রদেশে মার্কিন হামলায় সাত-আটজন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। একটি সেতুতে হামলায় দু’টি গাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন নিহত হন। এ ছাড়া বন্দর আব্বাসের একটি এলাকায় হামলায় এক নারী এবং আগুনে পুড়ে জ্বালানি সরবরাহকারী এক চালক মারা যান। হামলায় এক বছর বয়সী এক শিশুর একটি অঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
পাল্টা জবাবে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জর্দানের আল-আজরাক মার্কিন বিমানঘাঁটিতে একযোগে ধ্বংসাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসির দাবি, এতে অন্তত দু’টি মার্কিন যুদ্ধবিমান পুরোপুরি ধ্বংস এবং বেশ কয়েকটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জর্দানের ‘পবিত্র ভূমি’ থেকে মার্কিন বাহিনীকে উৎখাত করতে জর্দানের সেনাবাহিনীর প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে ইরান।
দোহা থেকে সাংবাদিক লরা খান জানিয়েছেন, এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত করছে এবং গুজব এড়িয়ে চলতে বলেছে। পাশাপাশি ইরানের অব্যাহত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নিন্দাও জানিয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত করতে দেশগুলো কূটনীতির ওপর জোর দিচ্ছে; তবে বর্তমান উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কেউই পিছু হটতে রাজি বলে মনে হচ্ছে না।
এ দিকে ইয়েমেনের হাউছি গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের বিরোধ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান ও কাতারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় আঞ্চলিক কূটনীতিকদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে।
চলমান এই সহিংসতায় কাতার নিজেই দু’বার হামলার শিকার হয়েছে। ওমান উপকূলেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি এবং বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত করেছে। ফলে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধের মুখে।
সমঝোতা স্মারক বাতিল ঘোষণা ইরানের
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্রমাগত চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে ইরান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক পুরোপুরি অকার্যকর ঘোষণা করেছে। আলজাজিরা জানায়, আগেও ইরানি কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেন এবং মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শর্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেবে বলে জানান। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং দেশটির কারিগরি আলোচনা দলের প্রধান কাজিম ঘারিভাবাদি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই সমঝোতা স্মারকের সব প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে এবং চুক্তিটি স্থগিত করেছে।
তিনি স্পষ্ট করে, পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও তাদের পক্ষ থেকে চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন স্থগিত করেছে এবং এখন থেকে মেনে চলতে বাধ্য নয়। এই প্রথম ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতা স্মারকটির কার্যকারিতা শেষ হওয়ার ঘোষণা দিলো। একই সাথে এই চুক্তির আর কোনো ধারা বা শর্ত তারা ভবিষ্যতে বাস্তবায়ন করবে না।
এ দিকে যেসব প্রতিবেশী দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তাদের ওপর হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানি গণমাধ্যম ‘ফার্স’ ইতোমধ্যে বাহরাইন, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাঁচটি কৌশলগত সমুদ্রবন্দরের তালিকা প্রকাশ করেছে, যেগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। অন্য দিকে মার্কিন বাহিনী ইরানের টানেল, রাস্তা, সেতু ও রেলপথে হামলা চালানোয় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তীব্র হয়েছে। ইসরাইলি বিশ্লেষক ড্যানি সিট্রিনোভিচ শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, প্রতিটি মার্কিন পদক্ষেপের বিপরীতে ইরানও পাল্টা শক্তি প্রদর্শন করছে। এর ফলে সঙ্ঘাত উভয়পক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে একটি ব্যাপক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই সঙ্ঘাত শেষ পর্যন্ত কূটনীতির সব পথ বন্ধ করে দিতে পারে।
অন্য দিকে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান আরো বিস্তৃত করার সম্ভাবনা বাড়ছে। এমন ইঙ্গিত সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলকে জানিয়েছে, দেশটিতে আরো কয়েক ডজন রিফুয়েলিং ট্যাংকার (আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী) সামরিক বিমান পাঠানো হবে। তিনজন মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন বলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে অ্যাক্সিওসের সাংবাদিক বারাক রাভিদ।
তথ্য মতে, হোয়াইট হাউজের সিচুয়েশন রুমে নতুন কয়েকটি সামরিক পরিকল্পনা উপস্থাপনের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরো বৃহৎ পরিসরের সামরিক অভিযানের বিষয়টি বিবেচনা করছেন। সম্ভাব্য এ অভিযান হরমুজ প্রণালী এলাকায় চলমান হামলার চেয়ে অনেক বিস্তৃত হতে পারে। বিবেচনাধীন পরিকল্পনাগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বোমা হামলা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ আরো গভীরে চাপা দিতে পারমাণবিক স্থাপনায় অতিরিক্ত হামলা এবং নির্মাণাধীন বলে সন্দেহে থাকা পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন ভূগর্ভের স্থাপনায় হামলা। বর্তমানে ইসরাইলের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দক্ষিণ ইসরাইলের রামন বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬০টি ট্যাংকার বিমান অবস্থান করছে।
ইসরাইলি কর্মকর্তাদের দাবি, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরো কয়েক ডজন বিমান পাঠাতে চায় ওয়াশিংটন। এতে যুদ্ধের শুরুতে থাকাবস্থায় পৌঁছানো যাবে। তাদের মতে, আশপাশের অন্যান্য ঘাঁটির তুলনায় ইরানি হামলার ঝুঁকি কম হওয়ায় মার্কিন বাহিনী বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর থেকেই এসব বিমান পরিচালনা করতে বেশি আগ্রহী। যদিও ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি, তবে মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের মতে, তিনি এমন মাত্রার ক্ষয়ক্ষতি করতে চান, যাতে ইরান সরকার হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক দাবিগুলো মেনে নিতে বাধ্য হয়। তাদের ধারণা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প সামরিক অভিযান জোরদারের নির্দেশ দিতে পারেন। ইরান সরাসরি ইসরাইলে হামলা চালানো থেকে বিরত রয়েছে, কারণ এতে আরো বড় ধরনের পাল্টা হামলার আশঙ্কা রয়েছে বলে ইসরাইলি কর্মকর্তারা মনে করছেন।
তবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এক ভাষণে বলেন, ইরানের নেতাদের আমি শুধু একটি কথাই বলতে চাই- আমাদের ওপর হামলা হলে পরিস্থিতি শান্ত থাকবে, এমনটি ভাববেন না। আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। এবার প্রতিক্রিয়া হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি শক্তিশালী। ইসরাইলে মার্কিন রিফুয়েলিং বিমানগুলোর উপস্থিতি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।
মাসের পর মাস ধরে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে থাকা এসব বিমান বন্দরটির কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করছে। যুদ্ধের সময় এটি বড় সমস্যা ছিল না, কারণ তখন ইসরাইলের আকাশসীমা প্রায় বন্ধ ছিল এবং অনেক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা তেল আবিবে ফ্লাইট স্থগিত রেখেছিল।
কিন্তু বর্তমানে আকাশপথ খুলে যাওয়ায় এবং গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে ভ্রমণ বেড়ে যাওয়ায় আরো মার্কিন সামরিক বিমান এলে বাণিজ্যিক ফ্লাইট ব্যাপকভাবে বাতিল হতে পারে। নির্বাচনের মাত্র তিন মাস আগে এমন পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর জোট সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর। মার্কিন প্রশাসন ইতোমধ্যে ইসরাইল সরকারকে অতিরিক্ত বিমানগুলোর জন্য ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছে।



