‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠায় আইন করতে যাচ্ছে সরকার

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

গ্রামীণ ব্যাংকের আদলে আরো ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠায় আইন করতে যাচ্ছে সরকার। এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ক্ষুদ্রঋণ কার্যকরভাবে পরিচালনা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য দূরীকরণ। এখানে সামাজিক ব্যবসাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৫’ নামে একটি খসড়া প্রণয়ন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ইতোমধ্যে খসড়া একটি কপি ওয়েবসাইটে প্রকাশও করা হয়েছে। এই খসড়ার ওপর বিভিন্ন অংশীজনের মতামত চাওয়া হয়েছে। বর্তমানে ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপকতা বাড়াতেই এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

ব্যাংকের কার্যক্রমের বিষয়ে খসড়ায় বলা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক একটি সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ব্যাংক জামানতসহ বা জামানত ছাড়া, নগদে বা অন্য কোনো প্রকারে, সকল প্রকার অর্থনৈতিক কার্যক্রম, বিশেষত- নতুন উদ্যোক্তাদের আত্মকর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ব্যবসা ও জীবনমান উন্নয়নে ঋণ প্রদান বা বিনিয়োগ করবে এবং লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আরোপিত শর্ত ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য আইনের অধীন শর্তপূরণ সাপেক্ষে সব বা যেকোনো কাজ করতে পারবে।

খসড়া অনুযায়ী, লাইসেন্স প্রাপ্তি সাপেক্ষে একাধিক ব্যক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে নিজস্ব অর্থায়নে এ ধরনের ব্যাংক স্থাপন করতে পারবে। ব্যাংকের প্রাথমিক অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন হবে যথাক্রমে ৩০০ কোটি ও ১০০ কোটি টাকা। মূলত ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথোরিটি আইন ২০০৬’-এর আওতায় সকল ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক পরিচালিত হবে এবং ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও লাইসেন্স অথোরিটি হচ্ছে ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথোরিটি’ (এমআরএ)। ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক পরিচালনার জন্য এমআরএ ‘মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথোরিটি আইন ২০০৬’-এর আওতায় একটি পৃথক বিভাগ বা দফতর স্থাপন করবে এবং পৃথক একজন নির্বাহীর দ্বারা এটি পরিচালিত হবে।

সূত্র জানায়, খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন প্রতিটি ১০০ টাকা মূল্যমানের তিন কোটি সাধারণ শেয়ারে বিভক্ত থাকবে। আর পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম ৬০ শতাংশ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা-শেয়ারহোল্ডার কর্তৃক পরিশোধ করা হবে এবং অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ শেয়ারহোল্ডারদের দ্বারা পরিশোধ করা যাবে। ব্যাংকের শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে মূলধন পরিশোধ করা যাবে। তবে কোনো স্টক এক্সচেঞ্জে এ ব্যাংক তালিকাভুক্ত হবে না।

খসড়ায় বলা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে পারবে। তবে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ হিসেবে প্রদেয় অর্থের পরিমাণ তাদের মোট বিনিয়োগের অতিরিক্ত হবে না। পরিশোধযোগ্য বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ওই অর্থের ওপর কোনো কর ধার্য থাকলে তা পরিশোধ সাপেক্ষে প্রদেয় নিট অর্থের পরিমাণ বোঝাবে। যেকোনো নীতিগত প্রশ্নে ব্যাংক লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুসরণ করবে।

খসড়া অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ হবে আট সদস্যবিশিষ্ট। এর মধ্যে একজন চেয়ারপারসন, একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ছয়জন মনোনীত পরিচালক থাকবেন। পর্ষদের মেয়াদ হবে তিন বছর।

ব্যাংকের চেয়ারপারসন নিযুক্ত হবেন পরিচালকদের ভোটের মাধ্যমে। আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক। তার চাকরির শর্তাবলি বিধি দ্বারা নির্ধারণ করা হবে। ছয় মনোনীত পরিচালকের মধ্যে ঋণগ্রহীতা-শেয়ারহোল্ডারদের দ্বারা তিনজন এবং অন্য শেয়ারহোল্ডারদের দ্বারা বাকি তিনজন মনোনীত হবে। কোনো মনোনীত পরিচালক একাদিক্রমে দুই মেয়াদের বেশি পরিচালক পদে থাকতে পারবেন না।

খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, আর্থিক স্থিতিজনিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের পূর্ব অনুমোদনক্রমে সরকার কর্তৃক গ্যারান্টিযুক্ত বিনিয়োগ ইনস্ট্রুমেন্টে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আমানত বিনিয়োগ করবে।

ব্যাংকের আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা করতে হবে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের তালিকাভুক্ত নিরীক্ষক দ্বারা। ‘ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন ২০১৫’-এর ধারা ২-এর দফা (৮)-এ প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক ‘জনস্বার্থ সংস্থা’ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে খসড়ায় বলা হয়েছে।

এ দিকে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথোরিটি গত জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, বর্তমানে দেশে ৭২৪টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণদাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান মোট ৪ কোটি ১৬ লাখ সদস্যকে সেবা দিচ্ছে, যার মধ্যে ৩ কোটি ২২ লাখ ঋণগ্রহীতা।