নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- হামলার পরিকল্পনা থেকে ট্রাম্পের শেষ মুহূর্তের পিছুটান
- ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার মূল্য ঘোষণার খবর
- ওয়াশিংটন তেহরানের কিছু দাবিতে নরম অবস্থানে
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো নতুন শান্তি প্রস্তাবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধাবসান, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং পূর্ববর্তী হামলায় হওয়া ক্ষয়ক্ষতি পূরণের দাবি করেছে তেহরান। এ দিকে ইরান এই খসড়া প্রস্তাবটি দেয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটিতে একটি বড় ধরনের সামরিক হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর অনুরোধে এবং একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প সেই হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধ ছাড়াই যদি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়, তবে তিনি খুশি হবেন। তবে চুক্তি সফল না হলে যেকোনো মুহূর্তে পূর্ণমাত্রার বৃহৎ হামলা চালানোর জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
আলজাজিরার সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই চলমান আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষকে এক করার যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে আমরা তাকে সমর্থন করি। তবে এই আলোচনা সফল হতে আরো কিছুটা সময় প্রয়োজন।’ ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের ঘোষণাকে ইতিবাচক সাড়া হিসেবে দেখলেও কাতার সতর্ক করেছে যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র দু’টি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ট্যাংকার পার হতে পেরেছে, যার অর্থ এই নয় যে স্বাভাবিক নৌচলাচল পুরোপুরি শুরু হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো দেশই এই প্রণালিতে বাধা সৃষ্টির অধিকার রাখে না।
এ দিকে আলোচনার টেবিলে তেহরানের অনড় অবস্থানের বার্তা দিয়ে ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আলোচনা মানেই আত্মসমর্পণ নয়। ইরান সম্পূর্ণ মর্যাদা, কর্তৃত্ব এবং নিজস্ব জাতির অধিকার রক্ষা করেই এই সংলাপে অংশ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নমনীয়তার ইঙ্গিত
এক মাস ধরে আলোচনা স্থবির থাকলেও সোমবার এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন কিছু দাবিতে নরম অবস্থান নিচ্ছে। ওই সূত্রের দাবি, বিভিন্ন বিদেশী ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের হাজার হাজার কোটি ডলারের অবরুদ্ধ তহবিলের চার ভাগের এক ভাগ (২৫ শতাংশ) ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যদিও ইরান পুরো তহবিল মুক্ত করার দাবিতে অনড়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নজরদারিতে ইরানকে কিছু শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কিছু নিশ্চিত করেনি। অন্য দিকে, আলোচনা চলাকালে ইরানকে তেল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা ছাড় দেয়ার একটি খবর মার্কিন কর্মকর্তারা নাকচ করে দিয়েছেন।
লেবাননে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শুরু করা মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ বোমাবর্ষণে ইরানে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, যা এপ্রিলের শুরুতে ছয় সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে স্থগিত হয়। তবে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযানে দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৪২ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৯ হাজার ৩০১ জন। আলজাজিরা জানায়, যুদ্ধবিরতি চললেও ইসরাইলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননের আরো ১২টি শহর ও গ্রামের বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার নতুন হুমকি দিয়েছে।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মাথার মূল্য ঘোষণা
এ দিকে, ব্রিটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য ডেইলিসি টেলিগ্রাফ’ এক চাঞ্চল্যকর খবরে জানিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মাথার ওপর পুরস্কার ঘোষণার একটি বিল নিয়ে ইরানের পার্লামেন্টে ভোটাভুটির প্রস্তুতি চলছে। ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা ব্যবস্থা’ শিরোনামের এই বিলটি তৈরি করেছেন ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি।
বিলটিতে মার্কিন ও ইসরাইলি নেতাকে হত্যার জন্য ৫ কোটি ইউরো পুরস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিহত হওয়ার ঘটনার ‘পাল্টা ও সমপরিমাণ পদক্ষেপ’ হিসেবে এই বিল আনা হয়েছে। কমিশনের সদস্য মাহমুদ নাবাভিয়ান জানিয়েছেন, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে যারা ‘জাহান্নামে পাঠাবে’ তাদের পুরস্কারের বিষয়টি আইনি কাঠামোর অংশ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ‘রক্তের অঙ্গীকার’ নামের একটি বেসরকারি উদ্যোগ ট্রাম্পকে হত্যার উদ্দেশ্যে পৃথকভাবে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার তুলেছে বলে জানা গেছে। গত বছর ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, ইরান এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে দেশটিকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে।



