হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক

Printed Edition
হার্ট  অ্যাটাক ও স্ট্রোক
হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক

ড. মুনীর উদ্দিন আহমদ

ইসলাম মানুষের নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনে বিশ্বাসী। আল্লাহ মানুষকে চরমপন্থা বর্জন করে মধ্যপন্থা গ্রহণ করতে বলেছেন। শরীরের ওপর জুলুম বা অত্যাচার করা ইসলামসম্মত নয়। ইসলাম মানুষকে সত্য-মিথ্যা, সঙ্গত-অসঙ্গত ও ভুল-সঠিকের দ্বন্দ্ব নিরসনে জ্ঞানার্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। কিন্তু মানুষ মাত্রই ভুল করে, একবার নয়, শতবার ভুল করে। মানুষ বরাবরই শরীরের ওপর অত্যাচার ও জুলুম করে নানা ধরনের রোগ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, এক ধরনের দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী শরীর ও স্বাস্থ্যকে নিয়ে ব্যবসায় করতে গিয়ে চরম প্রতারণার আশ্রয় নেয়। আজ আপনাদের সামনে এমন একটি ন্যক্কারজনক মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করব যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে বিভ্রান্ত, বিপর্যস্ত ও বিনা কারণে অসুস্থ করে তুলেছে।

আমেরিকার ‘জার্নাল অব আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ইন্টারনাল মেডিসিনে’ চিনি-সংক্রান্ত এক অবিশ্বাস্য কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটিত হয়। এই খ্যাতনামা জার্নালটি ফাঁস করে দেয় যে, ১৯৬৭ সালে ‘দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে’ প্রকাশিত হার্ভার্ডের গবেষণা প্রবন্ধে চিনিকে বাদ দিয়ে হার্ট অ্যাটাকের জন্য একতরফাভাবে চর্বি ও কোলেস্টেরলকে দায়ী করার ঘটনাটি ছিল দুরভিসন্ধিমূলক। সুগার অ্যাসোসিয়েশন ভাড়া করা দুই গবেষককে চিনির পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য এবং চিনির দোষ চর্বি ও কোলেস্টেরলের ঘাড়ে চাপানোর জন্য ৬০ হাজার মার্কিন ডলার ঘুষ দেন।

পরিমিত চর্বি, কোলেস্টেরল হার্ট অ্যাটাকের মূল কারণ নয়। অতিমাত্রায় চিনি খাওয়ার ফলে মানুষ অসুস্থ হয় অথবা কার্ডিয়াক ফেইলিওরের কারণে মারা যায়। ডায়াবেটিক রোগীদের হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকে বেশি মারা যাওয়ার সাথে চিনির সম্পর্ক গভীর। কোলেস্টেরল ছাড়া একদণ্ডও আমাদের শরীর চলে না। অথচ এই মহাউপকারী কোলেস্টেরলকে মহাকালপ্রিট বানিয়ে ছাড়ল ঘুষখোর এই দুই গবেষক। হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস, কিডনি ফেইলিওরসহ অসংখ্য রোগের উৎপত্তির কারণ চিনি। চিনি হৃৎপিণ্ডের রক্তনালির অভ্যন্তরীণ দেয়ালে প্রদাহ সৃষ্টি করার মাধ্যমে ক্ষত সৃষ্টি করে। এই ক্ষতে আঁশ, প্ল্যাটিলেট, লাইপোফেইজ, চর্বি ও ক্ষতিকর কোলেস্টেরল ও ট্রান্স ফ্যাট জমে গিয়ে ইশকিমিয়া ও মাইওকার্ডিয়াল ইনফার্কশন সৃষ্টি করে। ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বলতে ‘ব্যাড কোলেস্টেরল’ বা এলডিএলকে বোঝায় না। ক্ষতিকর কোলেস্টেরল হলো ওসব পরিবর্তিত রাসায়নিক কোলেস্টেরল যৌগ, যা কোলেস্টেরলসমৃদ্ধ খাবারকে ১২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় অনেকক্ষণ রান্না করলে বা পোড়ালে অক্সিডেশনের মাধ্যমে প্রস্তুত হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা যুগ যুগ ধরে বলে এসেছেন এবং এখনো অনেকেই বলছেন, কোলেস্টেরলের কারণে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চিকিৎসকরা অনন্তকাল থেকে রোগীদের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর জন্য ভীষণ ক্ষতিকর ওষুধ প্রদান করে আসছেন এবং চর্বিজাতীয় খাবার না খেতে নিষেধ করে আসছেন। চিকিৎসকদের ধারণা, চর্বিজাতীয় খাবার কম খেলে এমনিতেই রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে আসবে। কিন্তু এই ধারণা সত্যি নয়। কারণ শরীরে কোলেস্টেরল বৃদ্ধির মূল কারণ চর্বিজাতীয় খাবার নয়; বরং অত্যাধিক পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় অর্থাৎ চিনি বা চিনি-জাতীয় খাবার খাওয়া।

এ প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য হলো- শরীরে অতিমাত্রায় কোলেস্টেরল বা এলডিএল তৈরি হতে পারে না যদি কেউ সব কিছু পরিমিত খায় বা গ্রহণ করে এবং নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করে। আর কোলেস্টেরলই হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের একমাত্র কারণ নয়। মাত্র কয়েক বছর আগে আবিষ্কৃত হলো, হৃৎপিণ্ডের শিরা-উপশিরার দেয়ালে প্রদাহ সৃষ্টিই হৃদরোগের মূল কারণ। মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরার দেয়ালে অনুরূপ প্রদাহ সৃষ্টি স্ট্রোকের কারণ। শরীরে ফ্রি রেডিক্যাল সৃষ্টিও হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের কারণ হিসেবে বিবেচিত প্রদাহ সৃষ্টিতে অবদান রাখে।

শরীর, মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখার জন্য পরিশোধিত চিনি, পরিশোধিত আটা, ময়দা এবং এসব শর্করা থেকে প্রস্তুত যাবতীয় প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খেতে হবে বা পরিহার করতে হবে। শিরা-উপশিরার প্রদাহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে চিনি বা বিভিন্ন শর্করা বা চিনিসমৃদ্ধ খাবার এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিশোধিত চিনি বেশি খাওয়া হলে তা অতি দ্রুত রক্তপ্রবাহে পৌঁছে যায়। আমাদের এই উপমহাদেশের মানুষ মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে ভাত, রুটি, চিনি, মিষ্টি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খায়। ভাত, রুটি, চিনি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার থেকে তৈরি হয় গ্লুকোজ। রক্তে ভেসে বেড়ানো কোটি কোটি গ্লুকোজ অণু শিরা-উপশিরার দেয়ালে অনবরত আঘাত হানে, আহত করে এবং পরিণতিতে প্রদাহ ও ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এ কারণেই ডায়াবেটিসের রোগীরা অত্যধিক পরিমাণে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন।

অবজ্ঞা, অবহেলা, সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা, পরিমিত পুষ্টিকর ও সুষম খাবার না খাওয়া, ধূমপান পরিহার না করা, ব্যায়াম না করা, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান না করা, লাইফস্টাইল পরিবর্তন না করা, দুশ্চিন্তামুক্ত ও নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন না করা এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ বিশ্বাস না রাখার কারণে আমরা স্ট্রোক ও হৃদরোগের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হই। সুস্থ থাকা আল্লাহর এক অশেষ নিয়ামত। কোনো কারণবশত অসুস্থ হয়ে পড়লে সুস্থতার জন্য আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করুন এবং সঠিক চিকিৎসা নিন। নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন, সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখে এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তন করে সবাইকে সুস্থ থাকার ব্রত গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা