বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সাম্প্রতিক চিত্র কিছুটা মিশ্র হলেও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ ২০ এপ্রিল প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক ধারা এবং প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্সে বড় উল্লম্ফন দেখা গেলেও, মূল্যস্ফীতি ও খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এখনো দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিজার্ভ ও মুদ্রাবাজারের চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী) ৩০.৩৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের জুন মাসে যা ছিল ২১.২০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে, ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার আভাস দিচ্ছে। ১৬ এপ্রিল ২০২৬-এ আন্তঃব্যাংক মুদ্রার বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে প্রতি ডলার ১২২.৭৭ টাকা। তবে গত এক বছরে টাকার অবমূল্যায়ন আমদানিকারকদের জন্য কিছুটা চাপের সৃষ্টি করেছে।
রেকর্ড রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়
অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) প্রবাস আয়ের প্রবাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। এ সময়ে ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬.৮৩ শতাংশ বেশি। একইসাথে রফতানি আয়েও ৭.৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩.৯৭ বিলিয়ন ডলার। এই দুই খাতের শক্তিশালী অবস্থান দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করছে।
মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম এখন মূল্যস্ফীতি। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮.৭১ শতাংশ। যদিও বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৬০ শতাংশে নেমেছে, তবুও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য নি¤œ ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস তুলছে। বিশেষ করে খাদ্য ও সেবা খাতে আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এর প্রধান কারণ।
ব্যাংকিং খাত ও খেলাপি ঋণের ক্ষত
দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য সবচেয়ে বড় অশনিসঙ্কেত হলো খেলাপি ঋণ। তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে খেলাপি ঋণের হার মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা ডিসেম্বরে কিছুটা কমে ৩০.৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের এই উচ্চ হার ব্যাংকিং খাতের তারল্য ও বিনিয়োগ সক্ষমতাকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করছে।
বিনিয়োগ ও রাজস্ব আদায়
চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২.২৩ শতাংশ। মোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ৩,৭০,৮৭৪ কোটি টাকা। তবে সঞ্চয়পত্র খাতে সরকার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। নেট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ নেতিবাচক (-৬,০৬৩ কোটি টাকা), যার অর্থ মানুষ নতুন বিনিয়োগের চেয়ে পুরনো বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছে বেশি।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
২০২৫ সালের সংশোধিত তথ্যানুযায়ী, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.৪৯ শতাংশ। অথচ এক দশক আগে এই হার ৭ শতাংশের ওপরে ছিল। করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা এই প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সারসংক্ষেপ চিত্র :
সূচক বর্তমান অবস্থা (২০২৬) মন্তব্য
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০.৩৭ বিলিয়ন ডলার ইতিবাচক
রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২৬.৮৩% অত্যন্ত শক্তিশালী
মূল্যস্ফীতি (মার্চ) ৮.৭১% উদ্বেগজনক
খেলাপি ঋণ ৩০.৬০% উচ্চ ঝুঁকি
বিনিময় হার ($) ১২২.৭৭ টাকা স্থিতিশীল হওয়ার চেষ্টা
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের সুফল ধরে রাখতে হলে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর দিকে সরকারকে কঠোর নজর দিতে হবে। নতুবা সামষ্টিক অর্থনীতির এই স্থিতিশীলতা টেকসই করা কঠিন হবে।



