জ্বালানি সঙ্কটের চাপে দেশের বিদ্যুৎ খাতে এক দিকে যেমন লোডশেডিং বাড়ছে, অন্য দিকে বাড়ছে ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভর্তুকির বোঝা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাগজে-কলমে অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবে জ্বালানি ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা এবং উচ্চ ব্যয়ের কারণে সেই সক্ষমতার বড় অংশই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে।
বিদ্যুৎ বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যাদের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। কিন্তু বাস্তবে এই সক্ষমতার বড় অংশ অলস পড়ে থাকে। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৭৩২ মেগাওয়াট, যেখানে চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৫৫২ মেগাওয়াট। একই দিনে সন্ধ্যার পিক আওয়ারে চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট, কিন্তু উৎপাদন ছিল মাত্র ১৪ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট। ফলে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হয়েছে। বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ১৬ এপ্রিল মোট ১৪৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় ৩৬০ মেগাওয়াট এবং ঢাকার বাইরে ১১২২ মেগাওয়াট। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট, বরিশাল ও রংপুর সব অঞ্চলেই লোডশেডিং হয়েছে। তবে গ্রামাঞ্চলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। অনেক এলাকায় দিনে ছয় থেকে আটবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে এবং মোট চার থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্য বলছে, দিনের বিভিন্ন সময়ে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ওঠানামা করছে। ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ঘণ্টাতেই কিছু না কিছু লোডশেডিং থাকছে। কখনো তা ২০০-৩০০ মেগাওয়াট, আবার কখনো এক হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। এই অনিশ্চয়তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গ্যাস সঙ্কট ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন না করেও কেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ খাতের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বছরে এই অঙ্ক দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। এই বিপুল অর্থ এমন কেন্দ্রগুলোর জন্য ব্যয় হচ্ছে, যেগুলোর অনেক চাই পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যয় বেশি। এসব কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল দ্রুত বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবেলার জন্য, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলো অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
এ দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে ফার্নেস অয়েল দিয়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ হতো ১০ থেকে ১২ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ থেকে ২২ টাকার মধ্যে। একইভাবে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এখন ২৫ থেকে ৩০ টাকার কাছাকাছি। এলএনজি আমদানির খরচও বেড়ে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশে বর্তমানে গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রতি ইউনিট প্রায় ১১ থেকে ১৩ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে, যা কয়েক বছর আগেও ছিল ৬ থেকে ৮ টাকার মধ্যে। এই খরচ বৃদ্ধির ফলে সরকারকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট এবং বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে সেই ভর্তুকি বজায় রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
জ্বালানি সঙ্কটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এই সমস্যার প্রকোপ বেশি। অনেক এলাকায় দিনে ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। শহরাঞ্চলেও নির্ধারিত সময়সূচির বাইরে হঠাৎ লোডশেডিং দেখা যাচ্ছে। এতে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শিল্পখাতে লোডশেডিংয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে রফতানি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তৈরী পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাত ইতোমধ্যে এই সঙ্কটের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে।
অন্য দিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়ও এই সঙ্কট বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। গরমের সময়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে, ছোট ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে যারা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল, যেমন ফ্রিজ, ফ্যান, সেচ পাম্প, ছোট কারখানা তাদের জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠেছে।
লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে অনেকেই জেনারেটর বা আইপিএস ব্যবহার করছেন, যা অতিরিক্ত ব্যয় বাড়াচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ সঙ্কট সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। একইসাথে বাড়ছে ডিজেল ও পেট্রলের চাহিদা, যা আবার জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বিদ্যুৎ খাতের এই সঙ্কট মোকাবেলায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। জ্বালানি আমদানি বাড়ানো, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানেএসব উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে। তবে বাস্তবতায় তা দ্রুত কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ছে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এই সঙ্কট কাটাতে হলে বিদ্যুৎ খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনা জরুরি। একইসাথে অপ্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে এই আর্থিক চাপ ভবিষ্যতে আরো বাড়বে এবং এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ক্যাপাসিটি চার্জের বাড়তি বোঝা, জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতি এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির ফলে দেশের বিদ্যুৎ খাত বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনে। পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত করতে না পারলে এই সঙ্কট আরো গভীর হয়ে জনদুর্ভোগকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে।



