আমিনুল ইসলাম
বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটাল রাষ্ট্রের দিকে এগোচ্ছে। সরকারি সেবা, ব্যাংকিং, শিা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে ব্যক্তিগত যোগাযোগÑ সবখানেই এখন ইন্টারনেটনির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তনের অন্ধকার দিকও সমান গতিতে বিস্তার লাভ করছে। ভয়াবহ হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। প্রতারণা, তথ্যচুরি, হ্যাকিং, ডিপফেক, আর্থিক জালিয়াতি, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, নারী ও শিশু হয়রানি, সব মিলিয়ে এক নতুন ধরনের অপরাধবাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু অপরাধের ধরন যত আধুনিক হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমতা কি সেই হারে বাড়ছে? অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট থাকলেও প্রযুক্তি, দ জনবল, সমন্বয় ও জনআস্থার ঘাটতিতে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না। ফলে বিচার ও প্রতিকারের আশায় পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও বেশিরভাগ ভুক্তভোগী কাক্সিত সহায়তা পাচ্ছেন না।
প্রতারণার ধরন বদলেছে, বাড়ছে ঝুঁকি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে সাইবার অপরাধের ধরন দ্রুত বদলেছে। আগে যেখানে মূলত ফেসবুক আইডি হ্যাক বা অনলাইন প্রতারণা সীমিত আকারে ছিল, এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া ভয়েস কোনিং, ডিজিটাল ব্ল্যাকমেইল এবং পরিচয় চুরি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতারক চক্রগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া বিনিয়োগ প্রকল্প খুলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করে কয়েক মিনিটেই অ্যাকাউন্ট খালি করে ফেলা হচ্ছে। আবার নারীদের ছবি ব্যবহার করে অশ্লীল কনটেন্ট তৈরি করে ব্ল্যাকমেইলের ঘটনাও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সচেতনতা কম হওয়ায় অপরাধীরা সহজেই ফাঁদ পাততে পারছে। একই সাথে অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত প্রযুক্তিগত প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় বেশির ভাগ েেত্রই অর্থ উদ্ধার বা অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইউনিট আছে, কিন্তু সমতা সীমিত
বর্তমানে সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এসব ইউনিটের বেশির ভাগই জনবল ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের সঙ্কটে ভুগছে। উন্নতমানের ডিজিটাল ফরেনসিক টুল, সার্ভার অ্যানালাইসিস সিস্টেম, ডেটা রিকভারি প্রযুক্তি কিংবা এআইভিত্তিক মনিটরিং সফটওয়্যারের ঘাটতি রয়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় বিদেশী সার্ভারে থাকা তথ্য সংগ্রহে দীর্ঘ আইনি জটিলতায় পড়তে হয়। আবার প্রযুক্তিগত প্রশিণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলির কারণেও দতা ধরে রাখা যাচ্ছে না। একজন কর্মকর্তা অভিজ্ঞ হয়ে উঠতেই প্রশাসনিক বদলিতে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। নতুন কর্মকর্তা এসে আবার শুরু থেকে প্রশিণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে সাইবার অপরাধ তদন্তে ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে।
জেলা পর্যায়ে নেই কার্যকর সেবা
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, রাজধানীর বাইরে বেশির ভাগ জেলায় কার্যকর সাইবার তদন্ত কাঠামো নেই। ফলে অনেক ভুক্তভোগীকেই অভিযোগ নিয়ে ঢাকায় আসতে হচ্ছে।
খুলনা, রংপুর, সিলেট, বরিশালসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, স্থানীয় থানায় গেলে অনেক সময় অভিযোগ গ্রহণে অনীহা দেখা যায়। কেউ কেউ শুনতে পানÑ “এটা আমাদের টেকনিক্যাল বিষয় না”, “ঢাকায় যোগাযোগ করুন” কিংবা “ফেসবুক হ্যাক হলে আমরা কিছু করতে পারব না” ধরনের মন্তব্য। পুলিশ সদর দফতরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কয়েক বছর আগে জেলা পর্যায়ে পৃথক সাইবার ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু অর্থসংস্থান, অবকাঠামো ও জনবল সঙ্কটে সেটি বাস্তবায়ন হয়নি।
এবার আসন্ন পুলিশ সপ্তাহে আবারো “স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট” গঠনের দাবি জোরালোভাবে তোলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
অপরাধের চেয়ে ধীর তদন্ত ব্যবস্থা
সাইবার অপরাধের বড় বৈশিষ্ট্য হলোÑএটি অত্যন্ত দ্রুত ঘটে এবং প্রমাণও দ্রুত মুছে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল ব্যাংকিং বা অনলাইন আর্থিক প্রতারণার েেত্র প্রথম ৩০ মিনিট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা না গেলে অর্থ বিভিন্ন স্তরে সরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু বাস্তবে অভিযোগ গ্রহণ, জিডি, অনুমোদন ও সমন্বয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়ে যায়।
একজন সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “অনেক সময় ভুক্তভোগী টাকা খোয়ানোর এক ঘণ্টার মধ্যে অভিযোগ দিলেও ব্যাংক, টেলিকম অপারেটর ও তদন্ত সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করতে করতে অপরাধীরা টাকা সরিয়ে ফেলে।”
তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে ‘রিয়েল টাইম সাইবার রেসপন্স’ ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে এখনো সেটি কার্যকর হয়নি।
বাড়ছে ডিপফেক ও এআই অপরাধ
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে যাচ্ছে এআইভিত্তিক সাইবার অপরাধ। ইতোমধ্যে দেশে ভুয়া ভিডিও ও ভয়েস তৈরি করে প্রতারণা ও মানহানির একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
নারীদের ছবি ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে অশ্লীল ভিডিও তৈরি করে ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগও বাড়ছে। শিশুদের ল্য করেও অনলাইন গ্রুমিং ও যৌন হয়রানির ঘটনা বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান আইনি কাঠামো ও তদন্ত পদ্ধতি এই নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবেলায় এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
“শুধু সফটওয়্যার কিনলেই হবে না” : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও আইটি বিশেষজ্ঞ তানভির হাসান জোহা নয়া দিগন্তকে বলেন, শুধু সাইবার ইউনিট বড় করলেই হবে না, এটিকে হতে হবে দ্রুত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং ভিকটিম-ফ্রেন্ডলি।
তার মতে, বর্তমানে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি তিগ্রস্ত হচ্ছে ফেসবুক হ্যাকিং, মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণা, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, ডিপফেক, শিশু নির্যাতন ও ই-কমার্স জালিয়াতিতে।
তিনি বলেন, “প্রতিটি জেলায় ২৪/৭ ডিজিটাল রেসপন্স সেল থাকা জরুরি। যেন কোনো ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে ‘এটা আমাদের বিষয় না’Ñ এই কথা না শোনেন।” তিনি আরো বলেন, ব্যাংক, টেলিকম, আইএসপি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে রিয়েল-টাইম সমন্বয়ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তার ভাষায়, “শুধু সফটওয়্যার কিনলেই হবে না, দ তদন্তকারী তৈরি করতে হবে। একই সাথে এআইভিত্তিক থ্রেট ইন্টেলিজেন্স ও অটোমেটেড স্ক্যাম ট্র্যাকিং সিস্টেম প্রয়োজন, যাতে একই প্রতারক বারবার মানুষকে টার্গেট করতে না পারে।”
সরকারের উদ্বেগ : প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, দেশের সরকারি ও বেসরকারিÑ উভয় খাতের সাইবার নিরাপত্তায় এখনো বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে।
তিনি বলেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের বড় অংশ এখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সংরতি। ফলে শুধু সরকারি সার্ভার নিরাপদ করলেই নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। তার মতে, রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণÑ সব অংশীজনকে যুক্ত করেই কার্যকর সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
জনআস্থা ছাড়া সফলতা অসম্ভব
বিশ্লেষকদের মতে, সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় সবচেয়ে বড় সঙ্কট শুধু প্রযুক্তির নয়, বরং জনআস্থার।
অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জা, হয়রানির ভয় বা তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় অভিযোগই করেন না। বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় অভিযোগ না করার প্রবণতা বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার পুলিশিং এমন হতে হবে যেখানে ভুক্তভোগী নিরাপদ বোধ করবেন। অভিযোগের অগ্রগতি অনলাইনে ট্র্যাক করার সুযোগ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া, তথ্যের গোপনীয়তা রা এবং মানবিক আচরণÑ এসব বিষয় নিশ্চিত না হলে মানুষ পুলিশের ওপর আস্থা ফিরে পাবে না।
কী করতে হবে এখন? : সংশ্লিষ্টদের মতে, সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদপে প্রয়োজনÑ প্রতিটি জেলায় স্বতন্ত্র সাইবার ইউনিট গঠন; ২৪/৭ ডিজিটাল রেসপন্স সেন্টার চালু; আধুনিক ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন; প্রশিতি জনবল ধরে রাখতে বিশেষ ক্যাডার বা দীর্ঘমেয়াদি পোস্টিং; ব্যাংক, টেলিকম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাথে তাৎণিক সমন্বয় ব্যবস্থা; সাধারণ মানুষের জন্য সহজ অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম ও হটলাইন; এআইভিত্তিক প্রতারণা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং স্কুল-কলেজ পর্যায়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিা।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, “সাইবার অপরাধ এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং নাগরিক আস্থার প্রশ্ন।”
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে যাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ। আর সেই লড়াইয়ে প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক, দ ও জনবান্ধব করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই।



