নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার উসকানিদাতা হিসেবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চাঞ্চল্যকর দাবি উত্থাপন করেছে প্রসিকিউশন।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনকালে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মিজানুল ইসলাম আদালতকে জানান, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক ও সহিংস সিদ্ধান্ত নিতে হাসানুল হক ইনু সরাসরি প্ররোচিত করেছিলেন। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে ইনু ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তার ফলে সংঘটিত অপরাধের ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়ভার কোনোভাবেই তিনি এড়াতে পারেন না।
আদালতে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম শেখ হাসিনার সাথে ইনুর একটি টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ডের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, জাসদ সভাপতি ওই কথোপকথনে চলমান গণ-আন্দোলনকে ‘জঙ্গিবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এবং যেকোনো মূল্যে এই আন্দোলন দমনের পক্ষে জোরালো মত দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি হলো, ইনুর মতো জোট নেতাদের উসকানিতেই শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার ও কঠোর দমন-পীড়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ মোট আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ইনুর বিরুদ্ধে এই বিচারিক কার্যক্রম চলছে। গত বছরের ২৬ আগস্ট উত্তরা থেকে গ্রেফতারের পর ২৫ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় এবং ডিসেম্বরে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।
অন্য দিকে দীর্ঘ ৯ দিন ধরে চলা আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। ইনুর প্রধান আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী প্রসিকিউশনের আনা সব অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে দাবি করেন, শেখ হাসিনার সাথে ইনুর যে কথোপকথনের কথা বলা হচ্ছে, তার কোথাও আন্দোলন দমনে গুলি চালানো, বোমা হামলা বা শারীরিক নির্যাতনের মতো কোনো নির্দেশের অস্তিত্ব নেই। আসামিপক্ষ আরো দাবি করে যে, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় হাসানুল হক ইনু সংসদ সদস্য পদে ছিলেন না এবং কুষ্টিয়ায় যে হত্যাকাণ্ডের দায় তার ওপর চাপানো হচ্ছে, ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না বলে মামলার সাক্ষীরাও স্বীকার করেছেন।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে গতকাল আসামিপক্ষের শুনানি শেষ হওয়ার পর প্রসিকিউশন তাদের পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন শুরু করে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য শেষ না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল আজ ৭ মে পর্যন্ত মামলার কার্যক্রম মুলতবি করেছেন। বর্তমানে কারাগারে থাকা ১৪ দলের এই নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আদালত পরবর্তী দিনে উভয়পক্ষের দাখিলকৃত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে এই ঐতিহাসিক মামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে।
সাক্ষীর অসুস্থতায় পেছাল জিয়াউলের মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ
আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত গুম-খুনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের দিন পিছিয়েছে। সাক্ষীর অসুস্থতার কারণে প্রসিকিউশনের আবেদনে তা মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ আবেদন করে প্রসিকিউশন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী জানান, এ মামলার পঞ্চম সাক্ষীর জবানবন্দী হওয়ার কথা ছিল গতকাল। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি। এ অবস্থায় সাক্ষ্যগ্রহণ মুলতবি করে নতুন তারিখ নির্ধারণের আবেদন করা হয়।
এর আগে, ২৩ এপ্রিল চতুর্থ সাক্ষী হাবিবুর রহমান মল্লিকের জেরা সম্পন্ন হয়। ২২ এপ্রিল তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। এ দিকে গতকাল সকালে কারাগার থেকে জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ না হওয়ায় পরে তাকে আবার কারাগারে নেয়া হয়।
জাহাজবাড়ি হত্যাকাণ্ড : অভিযোগ গঠন শুনানি ৭ জুন
রাজধানীর কল্যাণপুরে জাহাজবাড়ি নামের ভবনে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ৯ তরুণকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন নিয়ে শুনানির তারিখ আবারো পিছিয়েছে। এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ৭ জুন দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালে গতকাল প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী। তিনি এ মামলায় অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য আরো এক মাস সময়ের আবেদন করেন। পরে আগামী ৭ জুন দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে, ৬ এপ্রিল এ শুনানি হওয়ার কথা ছিল। তবে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা পিছিয়ে দেন আদালত। গত ৮ মার্চ এ মামলায় পলাতক ছয় আসামির পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের আবেদন করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম।
এ মামলায় বর্তমানে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন দু’জন। তারা হলেন- সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক ও ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো: আসাদুজ্জামান মিয়া।
শেখ হাসিনাসহ পলাতক অন্যরা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ডিএমপির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণ পদ রায় ও তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন। তাদের হাজির হতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি দু’টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন আদালত। চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের দেয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই রাতে রাজধানীর কল্যাণপুরে জাহাজবাড়ি নামে পরিচিত একটি বাড়িতে কথিত জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। ‘অপারেশন স্ট্রম-২৬।’ নামের ওই অভিযানে ৯ তরুণকে গুলি করে হত্যা করা হয়।



