রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো পৌরসভার খাদুন এলাকার ‘রনি নিট অ্যান্ড কম্পোজিট ডায়িং’ কারখানার নির্গত বর্জ্যে পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে। কারখানার বর্জ্যে আশপাশের পরিবেশ দূষণ, অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য নিঃসরণ করায় জলাশয়ের মাছের মৃত্যু ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এ ব্যাপারে খাদুন গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ আলী ভূঁইয়া বাদি হয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও তারাবো পৌরসভা প্রশাসক মো: সাইফুল ইসলামের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, খাদুন এলাকার রনি নিট কম্পোজিট ডায়িং কারখানার বর্জ্য ও দূষিত পানি কৃষি জমি, মাছের খামার ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ছে। কারখানা কর্তৃপক্ষ রাতের অন্ধকারে পার্শ্ববর্তী মাছের খামার, কৃষিজমি ও জলাশয়ে অপরিশোধিত ডায়িংয়ের বর্জ্য ও দূষিত পানি ফেলছে। পানির রঙ কুচকুচে কালো। কোথাও বা রঙিন ও দূষিত। এর পাশাপাশি এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে পানিবদ্ধতা, পানির ওপর ভাসছে ফেনা। চারপাশে অসহনীয় দুর্গন্ধ। পানির পচা দুর্গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা নাকে-মুখে রুমাল চেপে ধরে চলাফেরা করছে। আশপাশের মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কেউ চর্ম রোগে ভুগছেন, মশা-মাছির আক্রমণে অতিষ্ট হচ্ছেন।
ডাইং কারখানার ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) থাকলেও বিদ্যুৎ খরচ বাঁচাতে তা ব্যবহার না করে নিজেদের ডাইংয়ের বিষাক্ত পানি একটি পাইপের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষিজমি ও সেচখালে ফেলা হচ্ছে। সেখান থেকেই পুরো এলাকায় এই দূষিত পানি ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ডাইং কারখানার বর্জ্য কৃষিজমিতে ফেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা কারখানার পাইপ বন্ধ করে দেয়ায় পানিবদ্ধতা আরো বেড়ে যাচ্ছে। এসবের কোনো কিছুতেই যেন কারখানাটির দূষণ ও অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না।
খাদুন এলাকার স্কুল শিক্ষিকা রাহিমা বেগম রেনু বলেন, ডাইং কারখানার বিষাক্ত পানির কারণে আমাদের এলাকার রাস্তাঘাট ও বাড়ি মাঝে মধ্যে বিষাক্ত পানিতে তলিয়ে যায়। প্রতিবাদ করলে হুমকি দেয়া হয়। মৈকুলী এলাকার কৃষক রিপন মিয়া বলেন, কারখানা থেকে নির্গত অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য আশপাশের খাল ও জলাশয়ে মিশে পানি দূষিত করছে। এতে জলাশয়ে মাছ মরে যাচ্ছে। কৃষিজমিতে দূষিত পানি জমে থাকায় ফসল উৎপাদন করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া ও দুর্গন্ধে আশপাশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদফতরের উপ-পরিচালক এ এইচ এম রাশেদ বলেন, রনি ডায়িংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন সদর দফতরে পাঠানো হয়েছে।
পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ হোসেন বলেন, শিল্পকারখানার বর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধন না করে ফেললে শুধু জলজ প্রাণীই নয়, কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। তাই জরিমানার পাশাপাশি পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এ ব্যাপারে রনি নিট কম্পোজিট ডাইং কারখানার জেনারেল ম্যানেজার নুরুল ইসলাম বলেন, কারখানার ইটিপি নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে। কারখানার নির্গত বর্জ্য পৌরসভার ড্রেনে চলে যায়। অতিবর্ষণে ড্রেনের পানি বেড়ে গিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে ।
রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ মারজানুর রহমান বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতে গত মাসে পরিবেশ দূষণের অভিযোগে ওই প্রতিষ্ঠানকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও তারাবো পৌর প্রশাসক মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, রনি নিট অ্যান্ড কম্পোজিট ডায়িং কারখানার নির্গত বর্জ্যে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনায় এলাকাবাসীর দেয়া লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া টানা বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকাতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ করছে।



