জলবায়ু অর্থায়ন ও গ্যাস নির্গমন কমানোর প্রশ্নে বাড়ছে হতাশা

এসবি-৬৪ সম্মেলন

Printed Edition

শাহ আলম নূর জার্মানির বন থেকে

জার্মানির বন শহরে অনুষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মধ্যবর্তী বৈশ্বিক আলোচনা (এসবি-৬৪) কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেও জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন সহায়তা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় উন্নয়নশীল ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে হতাশা বেড়েছে। বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো প্রতিশ্রুত অর্থায়নের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বৃহৎ নির্গমনকারী দেশগুলোর আরো কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।

১০ দিনব্যাপী এই বৈঠকের সমাপনীতে জাতিসঙ্ঘ জলবায়ু পরিবর্তন কাঠামো সনদের (ইউএনএফসিসিসি) নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল বলেন, বিশ্ব এখন নতুন প্রতিশ্রুতির অভাবে নয়, বরং বিদ্যমান অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ঘাটতিতে ভোগছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য অর্জন আরো কঠিন হয়ে পড়বে।

বন বৈঠকে জাস্ট ট্রানজিশন, জলবায়ু শিক্ষা, জনসম্পৃক্ততা, অভিযোজন ও প্রশমনসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হলেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করার প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

সমাপনী বক্তব্যে সাইমন স্টিল বলেন, ইতিহাস কখনো বড় ঘোষণার মাধ্যমে, আবার কখনও দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন বিষয়ে সমাধানের চেষ্টা হয়েছে, তবে অভিযোজন ও প্রশমন সংক্রান্ত অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক দশকে জলবায়ু নিয়ে অসংখ্য আন্তর্জাতিক চুক্তি ও ঘোষণা হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। জাতিসঙ্ঘের তথ্যানুযায়ী, বর্তমান নীতিমালা অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষে বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ২ দশমিক ৬ থেকে ৩ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির সীমা অতিক্রম করলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া, খাদ্যনিরাপত্তা সঙ্কট এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বেড়ে যাবে।

সাইমন স্টিল আরো বলেন, প্যারিস চুক্তি, প্রথম গ্লোবাল স্টকটেক, লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল, বার্ষিক ৩০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন এবং ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার সংগ্রহের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এসব সিদ্ধান্ত আবার আলোচনার বিষয় নয়; এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেগুলোর বাস্তবায়ন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও বন্যার কারণে আগামী কয়েক দশকে উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের মোট ভূমির প্রায় ৩০ শতাংশ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত, যেখানে প্রায় চার কোটি মানুষের বসবাস। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়লে দেশের উল্লেখযোগ্য অংশ প্লাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও ভোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় লবণাক্ততার প্রভাব কৃষি উৎপাদন ও সুপেয় পানির প্রাপ্যতাকে সঙ্কুচিত করছে। অথচ বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান ১ শতাংশেরও কম।

এসবি-৬৪ বৈঠকে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) প্রতিনিধিরা অভিযোজন অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলে দ্রুত অর্থায়নের দাবি জানান। বিশ্বের ৪৬টি স্বল্পোন্নত দেশের বেশির ভাগই জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুতর প্রভাবের মুখে রয়েছে। আফ্রিকার বহু দেশ দীর্ঘস্থায়ী খরা ও খাদ্যসঙ্কটে ভুগছে, আর প্রশান্ত মহাসাগরীয় ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো অস্তিত্বসঙ্কটে পড়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন ব্যয় বছরে ২১৫ থেকে ৩৮৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তা সেই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো ও সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া ও জাপান। বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের অর্ধেকেরও বেশি আসে এসব দেশ থেকে। বিপরীতে বাংলাদেশ, নেপাল, মালদ্বীপ, ভুটান ও বহু আফ্রিকান দেশের অবদান খুবই সামান্য হলেও জলবায়ু দুর্যোগের ক্ষতির ভার তাদেরই বেশি বহন করতে হচ্ছে। এ কারণেই ‘কম দায়, বেশি ক্ষতি’ নীতির ভিত্তিতে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার দাবি দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, কপ-২৭ সম্মেলনে লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ছিল। তবে তহবিলের কাঠামো চূড়ান্ত হলেও প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর দাবি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অনেক ক্ষতি অভিযোজনের মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; তাই এসব অপূরণীয় ক্ষতির জন্য পৃথক আর্থিক সহায়তা জরুরি।

সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (সিডিপি) নির্বাহী পরিচালক মো: জাহাঙ্গীর হোসেন মাসুম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘তুমি আগে পদক্ষেপ নাও’ ধরনের মানসিকতা জলবায়ু কূটনীতিকে অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবেলায় প্রতিটি দেশকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিনি বলেন, বন বৈঠকে ইতিবাচক অগ্রগতির অন্যতম ক্ষেত্র ছিল জাস্ট ট্রানজিশন বা ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তর। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের সময় শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি দেখা জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, বন বৈঠক আবারো প্রমাণ করেছে যে জলবায়ু সঙ্কট ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা। বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো এখন শুধু নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, প্রতিশ্রুত অর্থের দ্রুত ছাড়, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চায়। কারণ সময়ের সাথে সাথে ক্ষয়ক্ষতি ও ঝুঁকির মাত্রা বাড়ছে। বিশ্বের ৮০০ কোটি মানুষের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ন্যায্য অর্থায়ন এবং গৃহীত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতির বিকল্প নেই। জার্মানির বনে অনুষ্ঠিত এসবি-৬৪ বৈঠকের আলোচনাগুলো আগামী কপ-৩১ সম্মেলনের ভিত্তি তৈরি করবে বলে তিনি মনে করেন। পরবর্তী ধাপের আলোচনায় বাস্তবায়ন, অর্থায়ন এবং উচ্চাভিলাষী জলবায়ু কর্মসূচির দিকে আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বলে তিনি জানান।