চীনা বিনিয়োগকারীদের নতুন গন্তব্য বাংলাদেশ

মার্কিন শুল্কচাপ ও উৎপাদনব্যয় বৃদ্ধি

Printed Edition

শাহ আলম নূর

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা তৈরি পোশাক পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়া এবং চীনের নিজস্ব উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চীনা অ্যাপারেল খাতের উদ্যোক্তারা দ্রুত বিকল্প উৎপাদনস্থল খুঁজছেন। এ প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশ আবারো তাদের নজরের কেন্দ্রে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তথ্যে দেখা যায়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক (আরএমজি), টেক্সটাইল এবং সংশ্লিষ্ট খাতে চীনের প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। এতে কেউ নতুন কারখানা নির্মাণ করছে, কেউ বন্ধ বা অচল কারখানা অধিগ্রহণ করে দ্রুত উৎপাদনে যাচ্ছে, আবার কেউ প্রথমে লিজ নিয়ে ‘ট্রায়াল অপারেশনের’ মাধ্যমে বাজার পরীক্ষা করছে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন কম উৎপাদন ব্যয়, শ্রমশক্তির সহজলভ্যতা, ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং মার্কিন বাজারে চীনের তুলনায় তুলনামূলক কম শুল্কহার বাংলাদেশের প্রতি চীনা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াচ্ছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্যের জন্য ট্যারিফ সংঘাত, বাংলাদেশকে নতুন বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক পণ্যে গড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশ শুল্ক আরোপিত হলেও চীনা তৈরি পোশাকে এই হার প্রায় ৫০ শতাংশ এর কাছাকাছি। মার্কিন প্রশাসনের আরো শুল্ক বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও উঠে আসছে, যা চীনা রফতানির প্রতিযোগিতা হ্রাস করছে।

তথ্যে দেখা যায়, এক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের রফতানি কমছে। অন্য দিকে বাংলাদেশ, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশ ক্রমেই বাজার শেয়ার বাড়াচ্ছে। ফলে চীনা ব্র্যান্ড, সোর্সিং কোম্পানি এবং টেক্সটাইল সরবরাহকারীরা নতুন উৎপাদন বেস স্থাপনে দক্ষিণ এশিয়ার দিকে নজর দেয়া শুরু করেছে। যেখানে বাংলাদেশ অন্যতম সম্ভাবনাময় কেন্দ্র বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) এর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, শুধু গত এক বছরে ২০টির বেশি পোশাক কারখানায় চীনা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ এসেছে। এর মধ্যে নতুন করে কারখানা নির্মাণ যেমন রয়েছে, তেমনি ভাড়ায় নেয়া বা আগেই বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা অধিগ্রহণ করেও উৎপাদন শুরু করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। তার মতে, চীনের উদ্যোক্তারা সাধারণত আগে লিজ নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে উৎপাদন শুরু করেন যাকে তারা ট্রায়াল অপারেশন বলেন। এতে নির্মাণ ব্যয়ের চাপ কমে এবং দ্রুত মার্কেটে প্রবেশ সম্ভব হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে চীন থেকে ৫৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এসেছে। এর মধ্যে ৩০.৩৮ মিলিয়ন ডলার এসেছে টেক্সটাইল খাতে। এই খাতে চলমান সঙ্কট, গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা এবং কিছু কারখানার আর্থিক দুরবস্থার সুযোগে চীনা উদ্যোক্তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

দেশের বড় রফতানিকারক মাহমুদ গ্রুপের একটি কারখানা দীর্ঘ সময় যাবত বন্ধ বা আংশিক চালু ছিল। প্রতিষ্ঠানটি লিজ নিয়েছে একটি চীনা কোম্পানি। তারা দ্রুত কার্যকরী মূলধন জোগান দিয়ে এবং পুনর্গঠন করে উৎপাদন শুরু করেছে। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বিপণনসহ আন্তর্জাতিক অর্ডার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও হাতে নিয়েছে।

এদিকে শীর্ষ রফতানিকারক মাসকট গ্রুপের তিনটি কারখানা বিক্রির বিষয়ে একটি বড় চীনা কোম্পানির সাথে আলোচনা চলছে। শ্রমিকদের বেতন ও বকেয়া পরিশোধে অক্ষমতা, আর্থিক সঙ্কট ও অর্ডার কমে যাওয়ায় মালিকপক্ষ কারখানাগুলো বিক্রির পথে হাঁটছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এবং বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) তথ্য বলছে বাংলাদেশে বর্তমানে অন্তত ১৮টি চীনা পোশাক, টেক্সটাইল ও অ্যাক্সেসরিজ সংক্রান্ত কোম্পানি নতুন কারখানা চালু করেছে বা জমি লিজ নিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ২৪টি চীনা কোম্পানি বেপজায় লিজ চুক্তি করেছে। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি পোশাক বা টেক্সটাইল খাতের ব্যবসার সাথে জড়িত।

বাংলাদেশে বিনিয়োগকারী চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে জিংচেন টেক্সটাইল, চিক উইংস ইনটিমেটস, বাংলাদেশ বাওরুই টেক্সটাইল, আইএন বাটন, জিডালাই কোম্পানি, বাংলাদেশ বয়াং টেক্সটাইল, ডিং ইউ এন্টারপ্রাইজ, সেফটি গার্মেন্টস বিডি এবং কাইসি গার্মেন্টস বাংলাদেশ। এ ছাড়া হংকংভিত্তিক হানদা ইন্ডাস্ট্রিজ বাংলাদেশে ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।

বিসিসিসিআই জানায়, ইপিজেডের বাইরে সাম্প্রতিক সময়ে ৮টি নতুন চীনা কোম্পানি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে চুনই (বিডি) টেক্সটাইল, লোটাস কমার্স, ট্রিসেন সোয়েটার, চায়না বেস্ট হাউসহোল্ড প্রোডাক্টস, অ্যামিগো বাংলাদেশ।

সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানান, চীনের নতুন বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ৮০০ মিলিয়ন ডলার নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এসব বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে বহুজাতিক টেক্সটাইল, গার্মেন্ট কারখানার সংখ্যা আরো বাড়বে এবং রফতানি আয়ও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। চীনের ফ্যাশন জায়ান্ট সোহো ফ্যাশন গ্রুপ ইতোমধ্যে ঢাকায় তাদের প্রতিনিধি অফিস চালু করে সম্ভাব্য বিনিয়োগ খাতগুলো যাচাই-বাছাই শুরু করেছে।

ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান বলেন, বিদেশী বিনিয়োগ নতুন প্রযুক্তি, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে শিল্পভিত্তি আরো শক্ত করবে বিশেষ করে যখন ভিয়েতনামে মজুরি ও জমির খরচ ব্যাপক বেড়েছে।

এ দিকে দেশের স্থানীয় উদ্যোক্তাদের একটি অংশ বেসিক পোশাক খাতে বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে সতর্ক। তাদের যুক্তি বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বেসিক টি-শার্ট, প্যান্ট, জার্সি ইত্যাদি উৎপাদনে সক্ষমতা দেখিয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগ বরং টেক্সটাইল, সিনথেটিক ফাইবার, ডাইং ও উচ্চমূল্য সংযোজনকারী আইটেমে হওয়া উচিত।

বিসিসিসিআই সভাপতি খোরশেদ আলম বলেন, বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট নতুন টেক্সটাইল বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে নতুন কারখানা স্থাপনের চেয়ে বন্ধ কারখানা অধিগ্রহণ বা যৌথ উদ্যোগে পুনরুজ্জীবন তুলনামূলক বেশি কার্যকর হতে পারে।

খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বাণিজ্যযুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, চীনা বিনিয়োগ তত বেশি দক্ষিণ এশিয়ার দিকে ঝুঁকবে। আর বাংলাদেশ যদি কাঠামোগত সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তবে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে তার অবস্থান আরো শক্ত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।