২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতন ঘটে আওয়ামী লীগের। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়ার পরও নানাভাবে দেশের রাজনীতিতে নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পতিত দলটি। একের পর এক নেয়া কৌশল যখন ব্যর্থ হচ্ছে ঠিক, তখনই পতিত রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থানের জন্য দেশের অভ্যন্তরে তাদের সহযোগী কিছু গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু অ্যাক্টিভিস্ট ও সুশীলসমাজের কিছু প্রতিনিধি তাদের সমর্থনে নানা ন্যারেটিভ তৈরি করে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। সম্প্রতি হাম বিশেষজ্ঞ হয়ে ফ্যাসিস্টের সহযোগী কয়েকজন বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে বিষোদগার করে এক হাত নিয়েছেন। যদিও জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত বর্বর হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধের পরও গত দেড় বছরে ওই অঙ্গনের কোনো স্তরের নেতৃত্বের মধ্যেই বিন্দুমাত্র অনুশোচনা প্রকাশ করতে দেখা যায়নি; বরং ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষ ও শিশু হত্যার দায় এড়াতে পুলিশের নিহত হওয়ার ঘটনাকে বারবার সামনে এনে তাদের অবস্থানকে ‘জাস্টিফাই’ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গণ-অভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডার সংগঠন ও দলগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভেদ ও বিভক্তির রেখা স্পষ্ট হওয়ার সুযোগটি কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারো আওয়ামী লীগ ফিরে আসতে পারে- এমন আলোচনা চাওর হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পতিত রাজনৈতিক শক্তির নব্য সুশীলদের কেউ কেউ ‘আপা আসছে, বাংলাদেশ হাসছে’ এমন বক্তব্যও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তবে পতিত রাজনৈতিক শক্তির ফেরার কৌশলটি কী হতে পারে, পতিত দলটিকে রাজনৈতিক পুনর্বাসনে কে বা কারা সহায়তা করছে- এমন প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে ডালপালা মেলেছে।
সূত্রগুলো বলছে, গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ) আওয়ামী লীগের রাজনীতি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে মতামত তুলে ধরে একটি জরিপ পরিচালনা করে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত ওই জরিপে আওয়ামী লীগকে দেশের রাজনীতিতে আবার প্রাসঙ্গিক করার একটি ন্যারেটিভ দৃশ্যমান হয়। পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫৭ শতাংশ মানুষ আবার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে দেখতে চায় বলে দাবি করা হয়। এর মধ্যে ১৮-৩৪ বছর বয়সী তরুণ উত্তরদাতাদের ৫৩.৯ শতাংশ এবং ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের ৬০.৩ শতাংশ আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পক্ষে মত দেন। তবে নিষিদ্ধ রাখার পক্ষেও উল্লেখযোগ্য মতামত উঠে আসে। মোট উত্তরদাতার ৩৫.৩ শতাংশ মনে করেন, আওয়ামী লীগ আর রাজনীতিতে ফিরে আসা উচিত নয়। এর মধ্যে ১৮-৩৪ বছর বয়সীদের ৩৯.৯ শতাংশ এবং ৩৫ বছরের বেশি বয়সীদের ৩০.৮ শতাংশের অভিমত- অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে নিষিদ্ধ রাখা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, নিজেদের ভুল সিদ্ধান্ত ও দমননীতির কারণে আওয়ামী লীগ তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে সঙ্কটময় সময় পার করছে। পতনের মাত্র চার মাসের মাথায় বিদেশী গণমাধ্যমের ওই জরিপে দলটিকে প্রাসঙ্গিক করে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করা হলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। অপরাধের মাত্রা এতটাই গুরুতর যে দীর্ঘ দেড় বছরেও পতিত দলটির প্রতি দেশের মানুষের মন তো গলেনি, বরং দিন যতই যাচ্ছে দেশের রাজনীতিতে দলটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে। তথ্যানুযায়ী জুলাই আন্দোলনে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। এমন বাস্তবতার মধ্যেও কিছু সুশীল নামধারী আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা মাঝে মধ্যে টেলিভিশন টকশোতে ভিন্ন ন্যারেটিভ উপস্থাপন করে দলটিকে আবার প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা করছেন। সভা সেমিনারের মাধ্যমে ইনিয়ে বিনিয়ে ‘আওয়ামী লীগই ভালো ছিল’ এমন বয়ান কৌশল তৈরি করে বাজারে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীতে চলমান সঙ্কট ‘হাম’ নিয়ে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ওই সেমিনারে শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়া এবং হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর পেছনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে টিকা না দেয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। যদিও তথ্যটির সত্যতা নিয়ে জনমনে সংশয় ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সেমিনারটির উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, সেমিনারটিতে যারা বক্তব্য দিয়েছেন, যারা গুরুত্বপূর্ণ আসন অলঙ্কৃত করেছেন তাদের কেউই ‘হাম’ বিশেষজ্ঞ নয়। তাহলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নয় এমন ব্যক্তিদের দিয়ে হঠাৎ সেমিনার করার পেছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে- তা নিয়ে সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সেমিনারে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকাকে বিতর্কিত করার জন্যও যেসব বক্তব্য উঠে এসেছে- পতিত দলের সমর্থকগোষ্ঠীর একটি অংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়। ওই সেমিনার অনুষ্ঠিত হওয়ার পরই ‘শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ আবারো বাংলাদেশে ফিরছে, রাজনীতিতে ফিরছে’ এমন প্রচারণা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভিত্তিতে চালানো হচ্ছে এবং আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করতে এ ধরনের বয়ান কৌশল ভাইরাল করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিতাড়িত হওয়ার পর পতিত আওয়ামী লীগ নানা ছদ্মবেশে ফেরার চেষ্টা করেছে। সেসব কৌশল যখন কোনো কাজে দেয়নি, এখন আবার ‘হাম লীগ’ হয়ে ফিরে এসে রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হওয়ার চেষ্টা করছে।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, ফ্যাসিস্ট আমলের সুবিধাভোগীরা তো চাইবে পতিত শক্তি আবারো রাজনীতিতে ফিরে আসুক। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেখা গেছে, কখনো আনসার সেজে, কখনো পুলিশ সেজে, কখনো গার্মেন্টকর্মী হয়ে আবার কখনো রিকশাওয়ালা সেজে- এরকম নানা ছদ্মবেশ ধারণ করে পতিত রাজনৈতিক শক্তি ফিরে আসতে চেয়েছে। এখন দেখা গেল হাম বিশেষজ্ঞ হয়ে কিছু ব্যক্তিকে পতিত শক্তির পক্ষে ইনিয়ে বিনিয়ে সাফাই গাওয়া হচ্ছে। তারা পরিকল্পিতভাবে অন্তর্বর্তী সরকারকেও বিতির্কত করতে চায়। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে বিতর্কিত করতে পারলে, পরে দেখা যাবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারকেও বিতর্কিত করার জন্য ওই শক্তি কৌশলে নানা ন্যারেটিভ উপস্থাপন করবে। এটি হলো ফ্যাসিস্ট শক্তির পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এসব ফ্যাসিস্ট সুবিধাভোগীকে কোনোভাবেই সেই সুযোগ দেয়া ঠিক হবে না। সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।



