মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহের নান্দাইল-আঠারবাড়ি সড়কে এখন যেন রঙের উৎসব। সড়কের দুই পাশে সারি সারি সবুজ গাছের ফাঁকে থোকা থোকা বেগুনি ফুল ছড়িয়ে দিয়েছে অন্যরকম এক সৌন্দর্য। বাতাসে দুলছে ফুলভরা ডালপালা, কোথাও আবার ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফুটে আছে রঙিন মেলা। পথচলতি মানুষের চোখে পড়লেই থমকে দাঁড়াতে হয়, এ যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক জীবন্ত ছবি।
স্থানীয়দের অনেকেই গাছটি চেনেন, আবার অনেকে কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইছেন এর নাম। বেগুনি রঙের এই মনোমুগ্ধকর ফুলটির নাম ‘জারুল’। গাছে ফুল ফোটার পর থেকেই নাম জানার আগ্রহ বেড়েছে সবার মধ্যে। পুরো সড়কজুড়ে এখন যেন জারুলের বেগুনি ছোঁয়ায় উৎসবমুখর পরিবেশ।
সোমবার দুপুরে আঠারবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে সারি সারি জারুলগাছে ফুটে আছে ফুল। স্কুল ছুটির পর ঘরমুখী শিশুরা থমকে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে দেখছে এই সৌন্দর্য। কেউ গাছে উঠে ফুল তুলছে, কেউ আবার হাতে নিয়ে দেখছে বেগুনি রঙের পাপড়ির মায়া।
তামিম, সায়ান, আঁখি ও ময়নাসহ অনেক শিশুই ফুল হাতে নিয়েছে; কিন্তু নাম বলতে পারেনি। তাদের উচ্ছ্বাসেই বোঝা যায়, নাম না জানলেও ভালোবাসা কম নয়। তামিমের সরল মন্তব্য, ‘নাম দিয়া কী অইবো, ফুলডা খুবই সুন্দর। বাড়িতে নিয়া পানি দিয়া রাখমু’- এই কথাতেই ফুটে ওঠে প্রকৃতির প্রতি শিশুমনের অকৃত্রিম টান।
গ্রীষ্মকালীন প্রকৃতিতে এখন কৃষ্ণচূড়া, সোনালুসহ নানা দেশীয় ফুলের সমাহার। তবে এর মাঝেও আলাদা করে নজর কাড়ছে জারুল। একসময় গ্রামগঞ্জ, নদীপাড়, হাওরাঞ্চল ও জলাভূমির আশপাশে প্রচুর দেখা মিলত এই গাছের। সময়ের পরিবর্তনে সেই প্রাচুর্য কিছুটা কমলেও এখনো প্রকৃতির বুকজুড়ে নিজের সৌন্দর্য ধরে রেখেছে জারুল। কোথাও একা, কোথাও দলবেঁধে বেগুনি ফুলে ভরে উঠছে গাছগুলো।
উদ্ভিদবিদদের মতে, জারুল বাংলাদেশের জলাভূমি অঞ্চলের একটি পরিচিত গাছ। ভারতীয় উপমহাদেশেই এর আদি নিবাস। পানিপ্রিয় এই গাছ জলাভূমির আশপাশে বেশি জন্মালেও শুকনো এলাকাতেও সহজে মানিয়ে নিতে পারে। সাধারণত ১০ থেকে ২৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে থাকে জারুলগাছ। গ্রীষ্মের শুরু থেকে শরৎকাল পর্যন্ত কচি পাতার ফাঁকে ফাঁকে থোকা থোকা বেগুনি ফুল ফুটে এক মনোরম দৃশ্য সৃষ্টি করে।
জারুল ফুলের ইংরেজি নাম ‘চৎরফব ড়ভ ওহফরধ’। এর বৈজ্ঞানিক নাম খধমবৎংঃৎড়বসরধ ংঢ়বপরড়ংধ। শুধু সৌন্দর্যেই নয়, ব্যবহারেও সমান গুরুত্বপূর্ণ এই গাছ। এর লালচে শক্ত কাঠ ঘরের কড়ি-বরগা, নৌকা ও আসবাব তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি জ্বর, কাশি ও অনিদ্রাসহ নানা রোগে এর ভেষজ গুণের কথাও জানা যায়।
প্রকৃতির এই বেগুনি উপহার যেন মনে করিয়ে দেয়- অল্প যতœ আর সচেতনতা থাকলেই আমাদের চার পাশ আরো রঙিন হয়ে উঠতে পারে। শহর-গ্রাম সবখানেই যদি আবার বাড়ানো যায় জারুলের সংখ্যা, তবে প্রতিটি সড়কই হয়ে উঠতে পারে এমনই এক রঙিন, প্রাণবন্ত পথচিত্র।



