আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট ব্যুরো
বাজারে সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে সিলেটে জাঁকজমকভাবে চালু করা হয়েছিল ‘কৃষকের হাট’। কিন্তু উদ্বোধনের মাত্র দু-এক দিন পরই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন খালি পড়ে আছে হাটের শেডগুলো। স্থানীয়দের অভিযোগ, মন্ত্রীকে খুশি করতেই তড়িঘড়ি করে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, যা এখন কৃষি বিভাগের ‘আইওয়াশ’ প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।
চলতি বছরের ১১ এপ্রিল সিলেট নগরের টিলাগড় পয়েন্টে প্রথমবারের মতো ‘কৃষকের হাট’-এর উদ্বোধন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। উদ্বোধনের সময় কৃষি বিভাগ জানায়, কৃষকেরা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি ভোক্তাদের কাছে কৃষিপণ্য বিক্রি করতে পারবেন। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং ভোক্তারাও কম দামে টাটকা সবজি ও কৃষিপণ্য কিনতে পারবেন।
প্রথম দিকে জানানো হয়েছিল, হাটটি প্রতিদিন বসবে। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সপ্তাহে শনি ও মঙ্গলবার হাট বসার ঘোষণা দেয়া হয়। তবে বাস্তবে উদ্বোধনের পরদিন একবার বাজার বসলেও এরপর আর কোনো দিন হাট চালু হয়নি। দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও ‘শনি’ ও ‘মঙ্গলবার’ আর ফিরে আসেনি কৃষকের হাটে।
সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, টিলাগড় পয়েন্টে নির্মিত শেডগুলো সম্পূর্ণ ফাঁকা পড়ে আছে। কোথাও কৃষক নেই, নেই কোনো ক্রেতার উপস্থিতিও। পুরো এলাকাজুড়ে বিরাজ করছে নীরবতা। সিলেট সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শওকত জামিল দাবি করেন, হাটটি কাগজে-কলমে চালু রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বর্ষা মৌসুম হওয়ায় স্থানীয়ভাবে সবজি উৎপাদন কিছুটা কম। তাই কৃষকেরা হাটে আসছেন না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার কৃষকেরা হাটে পণ্য নিয়ে আসবেন।’
তিনি আরো জানান, উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ যৌথভাবে বাজার তদারকি করছে। তবে বাস্তবে বাজারে কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
কৃষি বিভাগের এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের ভাষ্য, বর্ষার অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সিলেটের বিভিন্ন গ্রামীণ বাজারে এখনো পর্যাপ্ত পরিমাণ স্থানীয় সবজি ও কৃষিপণ্য বিক্রি হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের সমন্বয়হীনতা এবং দায় এড়ানোর প্রবণতার কারণেই সম্ভাবনাময় উদ্যোগটি মুখ থুবড়ে পড়েছে।
স্থানীয় সোনারপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হক আনহার বলেন, কৃষকের হাট উদ্যোগটি খুব ভালো লেগেছিল। আমরা ভেবেছিলাম সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে তাজা সবজি কিনতে পারব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটি শুধু লোক দেখানো আয়োজন ছিল। দু-এক দিন গিয়ে ফিরে এসেছি।
টিলাগড়ের শাপলাবাগ এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, বলা হয়েছিল প্রতি শনি ও মঙ্গলবার হাট বসবে। এখন শনি-মঙ্গলবার এলেই গিয়ে দেখি শেড ফাঁকা পড়ে আছে। পুরো জায়গা হাহাকার করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষিপণ্য ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে সাধারণত চার থেকে পাঁচ ধাপে হাতবদল হয়। এতে প্রতিটি স্তরে দাম বাড়লেও প্রকৃত কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না। আবার ভোক্তাদেরও বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ও সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ বলেন, সিলেটে কৃষকের হাটের মতো জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ এভাবে থমকে যাওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। কৃষি বিভাগের উচিত ছিল কৃষকদের নিয়মিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বর্ষার অজুহাত না দিয়ে দ্রুত এই হাট পুনরায় চালুর ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো: শামসুজ্জামান বলেন, হাট চালু রয়েছে এবং নিয়মিত চলছে। তবে উদ্বোধনের পর আর বাজার না বসার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে সবজি উৎপাদন কমে গেছে। তাই হয়তো কৃষকেরা আসছেন না। তবে শুক্রবারও একজন কৃষক যোগাযোগ করেছেন। শিগগিরই আবার হাট চালু হবে বলে আশা করছি।



