শাহ আলম নূর
বাংলাদেশের শিল্প খাত ধীরে ধীরে এক ধরনের ‘নীরব মন্দা’র মধ্যে প্রবেশ করছে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা। বড় ধরনের ধস দৃশ্যমান না হলেও উৎপাদন কমে যাওয়া, নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়া, ছোট শিল্পে কারখানা আংশিক বন্ধ থাকা এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সঙ্কটে শিল্প সমতা হ্রাস, সব মিলিয়ে দেশের শিল্প অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্দার প্রভাবে তৈরী পোশাক খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং জ্বালানিনির্ভর উৎপাদন খাত সবচেয়ে বেশি তির সম্মুখীন হয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সঙ্কটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন, রফতানি ও কর্মসংস্থান ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এই সময়টাকে অনেকে ‘নীরব মন্দা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরী পোশাক খাত থেকে। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং স্থানীয় জ্বালানি সঙ্কট মিলিয়ে এই খাত এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্যে দেখা যায়, চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কটের কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন সমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। বিশেষ করে গাজীপুর, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া এবং দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানাগুলো নির্ধারিত উৎপাদন ধরে রাখতে পারছে না।
এদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক শিল্প এলাকায় প্রতিদিন দুই থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও তা ছয় ঘণ্টাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে সময়মতো রফতানি চালান পাঠাতে সমস্যায় পড়ছেন উদ্যোক্তারা। বিলম্বের কারণে বিদেশী ক্রেতাদের কাছে জরিমানা গুনতে হচ্ছে, আবার অতিরিক্ত খরচে এয়ার শিপমেন্টও করতে হচ্ছে।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নয়া দিগন্তকে বলেন, মন্দার আগে একটি মাঝারি আকারের কারখানা মাসে ১০ লাখ পিস পোশাক উৎপাদন হতো, এখন সেখানে ৭ লাখ পিসেও পৌঁছানো যাচ্ছে না। গ্যাসের চাপ থাকে না, বিদ্যুৎ চলে যায়, আবার বিদেশী ক্রেতারা দামও বাড়াচ্ছেন না। এতে লাভ তো দূরের কথা, টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকঋণের সুদহার বাড়ায় কার্যকর মূলধন জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বর্তমানে উচ্চ সুদহার ও তারল্য সঙ্কটের কারণে ব্যাংকগুলো নতুন শিল্পঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু গার্মেন্টস নয়, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতেও সঙ্কট গভীর হচ্ছে। প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং, আসবাবপত্র ও নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনকারী ছোট কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। তারা বলছেন, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ডলারের উচ্চ মূল্য এবং জ্বালানি সঙ্কটে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
নারায়ণগঞ্জের একটি প্লাস্টিক কারখানার মালিক আবদুল কাদের নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ সঠিক ভাবে পাওয়া গেলে তিন শিফটে কাজ করা সম্ভব। এখন জ্বালানি সঙ্কটে এক শিফট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। উৎপাদন কমলেও শ্রমিক ও বিদ্যুৎ বিলের চাপ কমছে না। ব্যাংক থেকে নতুন ঋণও পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্যে দেখা যায়, অনেক ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠান বর্তমানে উৎপাদন সমতার মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। কিছু খাতে নতুন বিনিয়োগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় উৎস হওয়ায় এই সঙ্কট দীর্ঘ হলে শ্রমবাজারেও বড় প্রভাব পড়বে।এদিকে টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে ইতোমধ্যে এর প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক বছরে ২০০টির বেশি গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কয়েক হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। অনেক কারখানায় ওভারটাইম কমিয়ে দেয়া হয়েছে এবং নতুন নিয়োগ বন্ধ রাখা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের শিল্প খাত এখন দ্বৈত চাপের মধ্যে রয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজার দুর্বল, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও আর্থিক সঙ্কট। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে শিল্প খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বড় ঝুঁকিতে পড়বে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সঙ্কটটি ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছে। বাইরে থেকে বড় মন্দা মনে না হলেও ভেতরে উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। এ কারণেই একে নীরব মন্দা বলা হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কট এখন শিল্প খাতের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সমতা বাড়লেও জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলার সঙ্কট এবং গ্যাস সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সমতায় চালানো যাচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প এলাকায়।
চট্টগ্রামের একটি মাঝারি ইস্পাত কারখানার পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ডলার সঙ্কটের কারণে এলসি খুলতে সমস্যা হচ্ছে। আবার কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত খরচ পড়ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। শিল্প খাতের বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ শিল্প খাতের সাথে ব্যাংকিং, পরিবহন, বন্দর, আবাসন এবং খুচরা বাজারসহ বহু খাত জড়িত। শিল্পে উৎপাদন কমে গেলে সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে যেতে পারে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমবাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আংশিক ছুটিতে পাঠানো, ওভারটাইম কমিয়ে দেয়া এবং অস্থায়ী শ্রমিক ছাঁটাইয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। শ্রম অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, অনানুষ্ঠানিকভাবে চাকরি হারানো মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যদিও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ হয়নি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল করা জরুরি। একই সাথে ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, কাঁচামাল আমদানিতে সহজ সুবিধা এবং রফতানি বাজার বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি সঙ্কটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সমতা তিগ্রস্ত হতে পারে। তারা বলছেন, শিল্প খাতে ‘নীরব মন্দা’ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে তা শুধু শিল্প খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ব্যাংকিং, পরিবহন, আবাসন ও শ্রমবাজারসহ পুরো অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।



