হাবিবুল বাশার
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাসের পর এবার নৌপথেও লঞ্চের ভাড়া বৃদ্ধি করেছে সরকার। যাতায়াত খরচের এই বাড়তি বোঝার সাথে যুক্ত হয়েছে লাগামহীন বাড়ি ভাড়া এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী মূল্য। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিবহন ও আবাসন খাতের এই ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মূলত ভর্তুকি কমিয়ে আনা এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার খরচ অচিরেই দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে বাসের পর এবার লঞ্চের ভাড়াও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ‘বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন বিধিমালা, ২০১৯’-এর আওতায় এই নতুন ভাড়া গত সপ্তাহের মঙ্গলবার থেকেই কার্যকর হয়েছে। ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ৭৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৯৫ পয়সা করা হয়েছে (বৃদ্ধি ৬.৪৯ শতাংশ)। ১০০ কিলোমিটারের ঊর্ধ্বে ভাড়া ২ টাকা ৩৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৫২ পয়সা করা হয়েছে (বৃদ্ধি ৫.৮৮ শতাংশ)। রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে জ্বালানির দাম কমলে ভাড়া আবার সমন্বয় করা হবে।
ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া গত ২৩ এপ্রিল থেকেই কার্যকর হয়েছে। তবে এই ভাড়া বৃদ্ধিকে ‘চরম অযৌক্তিক’ বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। নাইমুল ইসলাম জিসান নামে একজন যাত্রী গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়ে দেখিয়েছেন, লিটারপ্রতি তেলের দাম ১৫ টাকা বাড়লে ১০০ কিলোমিটার পথে একটি বাসের খরচ বাড়ে মাত্র ৩৭৫ টাকা। অথচ প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা বাড়ানোয় ৪০ জন যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে প্রায় আট হাজার টাকা। প্রকৃত খরচের তুলনায় এই কয়েকগুণ বেশি অর্থ আদায়কে সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের জুলুম হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
যাতায়াত খরচের পাশাপাশি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে বাড়ি ভাড়া। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) তথ্যমতে, গত ২৫ বছরে ঢাকায় বাড়ি ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ, যা পণ্যমূল্য বৃদ্ধির হারের চেয়ে দ্বিগুণ।
২৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া তাদের আয়ের ৩০ শতাংশ ব্যয় করেন বাড়ি ভাড়ায়। ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া ব্যয় করেন আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ। ১২ শতাংশ অতি দরিদ্র ভাড়াটিয়া তাদের আয়ের ৭৫ শতাংশ ব্যয় করেন কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে। মিরপুরের এক বেসরকারি চাকরিজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কোনো নিয়মনীতি না মেনে বাড়িওয়ালারা ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়াচ্ছেন, ফলে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মামুন মাহফুজের মতে, জীবনযাত্রার এই ব্যয় অচিরেই দেড় থেকে দুই গুণ হয়ে যাবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভর্তুকি কমিয়ে আনা এবং মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলায় টাকা ছাপানোর ফলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
‘টাকা ছাপানোর ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাবে এবং বেকারত্ব চরম আকার ধারণ করবে। এর ফলে নিম্ন-মধ্যবিত্তরা কার্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং মধ্যবিত্তরা আরো নিচে নেমে আসবে।’
জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় বিশেষজ্ঞরা বৈশ্বিক পরিস্থিতির চেয়েও সরকারের নীতিগত সীমাবদ্ধতাকে বেশি দায়ী করছেন। তাদের মতে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের সমীকরণ মেলাতে গিয়ে চীনসহ অন্যান্য দেশের সহায়তা নেয়া হচ্ছে না। এছাড়া লিথিয়াম জ্বালানিকে বাজারজাত করতে পারলে বর্তমান খরচের অর্ধেক ব্যয়ে জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলা করা সম্ভব ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যথাযথ নীতিমালা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এখনই পদক্ষেপ না নিলে মধ্যবিত্তের এই মর্যাদা রক্ষার লড়াই অচিরেই চরম সঙ্কটে রূপ নিতে পারে।



