এডিপিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বরাদ্দ মাত্র ২.৮৯%

অ্যাকশন এইডের বাজেট সংলাপ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

  • শিক্ষা ও জেন্ডার বাজেট
  • হ্রাসে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র ঝুঁকিতে থাকলেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বরাদ্দ মাত্র ২.৮৯ শতাংশ। অন্য দিকে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ঘঅচ) ও এনডিসি (ঘউঈ) বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে এক বিশাল ঘাটতি রয়ে গেছে। একই সাথে গত পাঁচ বছরে দেশের শিক্ষা ও জেন্ডার বাজেটের বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ার প্রবণতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ভবিষ্যতে বিনিয়োগের সময় এখনই : নারী, তরুণ ও জলবায়ু সুরক্ষায় জনবান্ধব বাজেট’ শীর্ষক সংলাপে এসব তথ্য ও অভিমত তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, সরকারি নীতিনির্ধারক এবং তৃণমূলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সংলাপে উপস্থাপিত অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২.০৮ শতাংশ থেকে কমে ১.৭২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ৪৪টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার বাজেট প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলেও বর্তমানে এর আকার জিডিপির ৫.৭ শতাংশ থেকে সঙ্কুচিত হয়ে ৪.২ শতাংশে নেমে এসেছে। নারীদের প্রত্যক্ষ জনসেবা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উপখাতগুলোতে বরাদ্দ হ্রাস পাওয়ার কারণে তৃণমূল পর্যায়ে সহিংসতা প্রতিরোধ ও আইনি সহায়তার মতো উদ্যোগগুলো সক্ষমতার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অভিনন্দিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন) ড. সাইমুম পারভেজ। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের বাজেট জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের বড় সুযোগ। সরকারের নীতিনির্ধারণে এখন ‘মানুষকেন্দ্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন (ধিংঃব-ঃড়-বহবৎমু), ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কার্বন ট্রেডিংয়ের মতো নতুন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে, যেখানে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কার্বন ট্রেডিংয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও যুব উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে একটি জলবায়ু-সচেতন ও জেন্ডার-রেসপনসিভ উন্নয়ন আদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, শুধু জিডিপি বরাদ্দ বাঁচালেই হবে না, তরুণরা যদি উপযুক্ত শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে না পারে, তবে উন্নয়নের সুফল মিলবে না। জেন্ডার বাজেট কমে যাওয়ার প্রবণতা নারীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সুযোগকে ঝুঁকিতে ফেলবে। ‘গ্লাস সিলিং’ ভাঙতে তিনি নারী প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ে রাষ্ট্রীয় সহায়তার বৈপ্লবিক পরামর্শ দেন।

অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, জেন্ডার বাজেটকে শুধুমাত্র নারীদের জন্য আলাদা বরাদ্দ হিসেবে দেখা ভুল; এটি সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাঠামোর অংশ। বরাদ্দের বড় অংশই প্রশাসনিক পর্যায়ে শেষ হয়ে যায় উল্লেখ করে তিনি অবৈতনিক কাজের স্বীকৃতি ও নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।

জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ ড. আহসান উদ্দিন আহমেদ এক চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে করে বলেন, গত এক দশকে প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয় জলবায়ু কার্যক্রমে যুক্ত হলেও তাদের গড় বাস্তবায়ন সক্ষমতা মাত্র ৭ শতাংশ। দুর্বল জবাবদিহিতার কারণে জলবায়ু ঝুঁকি কমছে না উল্লেখ করে তিনি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থার দাবি জানান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক শারমিন্দ নীলোর্মি বলেন, নারী, তরুণ ও জলবায়ু ইস্যুকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক প্রকল্প বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং ঋণনির্ভর উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।

আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন সুনির্দিষ্ট বরাদ্দের অভাবে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা না কমার বিষয়টি তুলে ধরেন এবং উন্নয়ন বাজেটে এর সরাসরি স্বীকৃতি দাবি করেন। তবে পরিকল্পনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো: গোলাম মোছাদ্দেক জানান, সরকারের মূল লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয় বৈষম্য হ্রাস করা। ইতোমধ্যে ১৫টি খাতে ‘ক্লাইমেট জাস্টিস’ যুক্ত করা হয়েছে এবং স্বচ্ছতা বাড়াতে ১০০% ডিজিটাল রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড চালু করা হয়েছে।

সংলাপ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশমালা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ২০২৮ সালের মধ্যে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (ঞঠঊঞ) নারীর অংশগ্রহণ ৪০ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি একটি বিশেষ ‘নারী উদ্যোক্তা তহবিল’ গঠন করা। এ ছাড়া ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ঙঈঈ) ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার আওতা বাড়ানো, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা রোধে স্থানীয় সরকার খাতে পৃথক বরাদ্দ দেয়া এবং যুব বাজেটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ‘ইয়ুথ বাজেট স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ ও রিয়েল-টাইম পাবলিক ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ড চালুর দাবি জানানো হয়। একই সাথে উপকূলীয় ও ডিজিটাল খাতের তরুণদের জন্য ‘ইয়ুথ এন্টারপ্রেনিয়রশিপ ফান্ড’ ৬০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা এবং জলবায়ুর ক্ষতিপূরণ ও অভিযোজনের জন্য সুনির্দিষ্ট ও পৃথক বাজেট কোড তৈরি করে স্থানীয় পর্যায়ে সরাসরি তহবিল হস্তান্তরের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।