সাক্ষাৎকার : প্রকৌশলী মাহমুদ হোসাইন

ব্যাংক খাতের বিদেশী প্রযুক্তিনির্ভরতা কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে

বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বর্তমান বাস্তবতায় ব্যাংক খাতের বিদেশী প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু প্রযুক্তিগত বা আর্থিক বিষয় নয়; এটি এখন জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ব্যাংক খাতের আইটি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী মাহমুদ হোসাইন বলেছেন, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বর্তমান বাস্তবতায় ব্যাংক খাতের বিদেশী প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু প্রযুক্তিগত বা আর্থিক বিষয় নয়; এটি এখন জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। মিলেনিয়াম ইনফরমেশন সলিউশন সিইও ও সহপ্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী মাহমুদ হোসাইন নয়া দিগন্তের সাথে কস্ট এফিশিয়েন্সি থেকে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব এবং বিদেশী কোর ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে বাংলাদেশের উত্তরণসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত-

প্রশ্ন : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের বর্তমান চিত্র আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

মাহমুদ হোসাইন : গত দুই দশকে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এক উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (ঈইঝ), অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ, এটিএম নেটওয়ার্ক- সবমিলিয়ে গ্রাহকসেবার গতি ও সহজলভ্যতা বেড়েছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও অনেক প্রসারিত হয়েছে। তবে এই অগ্রগতির ভেতরে একটি মৌলিক দুর্বলতা রয়ে গেছে- আমরা এখনো মূলত বিদেশী প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।

প্রশ্ন : এই নির্ভরতা কেন এখন বড় উদ্বেগের কারণ?

মাহমুদ হোসাইন : আগে বিদেশী সিবিএস গ্রহণ ছিল আধুনিকায়নের একটি স্বাভাবিক ধাপ। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায়- যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ছে- এই নির্ভরতা কৌশলগত ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু প্রযুক্তিগত বা আর্থিক বিষয় নয়; এটি এখন জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।

প্রশ্ন : কোর ব্যাংকিং সিস্টেমকে ‘কৌশলগত জাতীয় সম্পদ’ বলা হচ্ছে কেন?

মাহমুদ হোসাইন : সিবিএস মূলত একটি ব্যাংকের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র। প্রতিটি লেনদেন, গ্রাহক তথ্য, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিপোর্টিং- সবকিছুই এই সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে সিবিএসের ওপর নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু একটি সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং একটি ব্যাংকের কার্যক্রমের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। আর যখন একাধিক ব্যাংক একই ধরনের বিদেশী সিস্টেম ব্যবহার করে, তখন তা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে।

প্রশ্ন : বৈদেশিক মুদ্রা খরচের দিকটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

মাহমুদ হোসাইন : এটি একটি বড় অর্থনৈতিক চাপ। প্রাথমিকভাবে সিবিএস স্থাপনে বিপুল বিনিয়োগ লাগে, তবে আরও বড় বিষয় হলো চলমান ব্যয়- লাইসেন্স ফি, আপডেট, রক্ষণাবেক্ষণ, কাস্টমাইজেশন- সবই বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। অনুমান করা হয়, বছরে ৬০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিদেশে চলে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের মতো মূলধন বহির্গমনে রূপ নিতে পারে।

প্রশ্ন : খরচ ছাড়াও অন্য কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে?

মাহমুদ হোসাইন : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ডেটা নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌমত্ব। অনেক ক্ষেত্রে সফটওয়্যার আপডেট, সিস্টেম আর্কিটেকচার বা নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ থাকে। এতে প্রশ্ন ওঠে- আমাদের আর্থিক ডেটা কতটা নিরাপদ এবং আমরা কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারি। একটি ডেটা-চালিত অর্থনীতিতে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন : অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা কি এই ঝুঁকিকে স্পষ্ট করেছে?

মাহমুদ হোসাইন : অবশ্যই। ২০১৬ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার ঘটনার মতো ঘটনা আমাদের দেখিয়েছে, আর্থিক অবকাঠামোতে দুর্বলতা কত বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। যদিও এটি সরাসরি সিবিএসের সমস্যা ছিল না, তবে সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার ঘাটতি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা স্পষ্ট হয়েছে।

প্রশ্ন : এই নির্ভরতা কি শুধু সিবিএসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

মাহমুদ হোসাইন : না, এটি একটি বিস্তৃত সমস্যা। ব্যাংকগুলো এএমএল সিস্টেম, পেমেন্ট গেটওয়ে, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ, ঝুঁকি বিশ্লেষণ সফটওয়্যার- সবক্ষেত্রেই বিদেশী প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে। ফলে একটি বহুমাত্রিক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, যা পরিচালনাগত জটিলতা বাড়ায় এবং খরচও বৃদ্ধি করে।

প্রশ্ন : স্থানীয় সিবিএস কি বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে পারবে?

মাহমুদ হোসাইন : এখন আর এটি সম্ভাবনার প্রশ্ন নয়, বাস্তবতার বিষয়। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্থানীয়ভাবে উন্নত সিবিএস রয়েছে, যা দেশীয় প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি। এগুলো দ্রুত কাস্টমাইজ করা যায়, স্থানীয় নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পরিচালন খরচও তুলনামূলকভাবে কম।

প্রশ্ন : বিশেষায়িত খাত, যেমন ইসলামী ব্যাংকিং- সেখানে স্থানীয় সমাধানের গুরুত্ব কতটা?

মাহমুদ হোসাইন : ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মতো ক্ষেত্রে বিদেশী সফটওয়্যার অনেক সময় পুরোপুরি উপযোগী হয় না। মুনাফা ভাগাভাগি, শরিয়াহ কমপ্লায়েন্স ইত্যাদি বিষয়গুলো জটিল এবং প্রসঙ্গভিত্তিক। স্থানীয় সমাধান এখানে অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে, কারণ এগুলো দেশের বাস্তবতা ও ধর্মীয় কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা সম্ভব।

প্রশ্ন : স্থানীয় সমাধানে গেলে অর্থনীতিতে কী ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে?

মাহমুদ হোসাইন : সবচেয়ে বড় সুফল হলো বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়। বছরে যে অর্থ বিদেশে চলে যায়, তা দেশে বিনিয়োগ করা যাবে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতে উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান তৈরি হবে, নতুন উদ্ভাবন উৎসাহিত হবে এবং বাংলাদেশ ভবিষ্যতে ব্যাংকিং সফটওয়্যার রফতানিকারক দেশ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

প্রশ্ন : এই রূপান্তরের জন্য কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করা উচিত?

মাহমুদ হোসাইন : ধাপে ধাপে এগোনোই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদ্ধতি। প্রথমে হাইব্রিড মডেল- বিদ্যমান সিস্টেমের সাথে স্থানীয় মডিউল যুক্ত করা। এরপর নীতিগত প্রণোদনা, নিরাপত্তা মান নির্ধারণ এবং দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। একই সাথে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন : নীতিনির্ধারকদের জন্য আপনার প্রধান বার্তা কী?

মাহমুদ হোসাইন : এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়। আমরা যদি দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ এবং স্বনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থা চাই, তাহলে প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এটি শুধু একটি আইটি সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন- এই পরিবর্তনকে আপনি কিভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?

মাহমুদ হোসাইন : এটি একটি রূপান্তর- নির্ভরতা থেকে সক্ষমতার দিকে, ব্যয় থেকে বিনিয়োগের দিকে এবং ডিজিটালাইজেশন থেকে ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের দিকে। আগামী দশকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে- আমাদের ব্যাংকগুলো কতটা ডিজিটাল নয়, বরং কতটা স্বাধীন ও নিরাপদ। সেই দিক থেকেই এখন আমাদের এগোতে হবে।