নিজস্ব প্রতিবেদক
পরকীয়া প্রেমের কারণে খুন হয়েছেন ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার সৌদি প্রবাসী মোকাররম মিয়া (৩৭)। তাকে নৃশংসভাবে হত্যার পর লাশ ৮ টুকরা করে পলিথিনে ভরে রাজধানীর মুগদার মাণ্ডা প্রথম গলির একাধিক এলাকায় ফেলে রাখা হয়। চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রধান আসামি হেলেনা বেগম (৪০) ও তার মেয়ে হালিমা আক্তারকে (১৩) আলামতসহ আটক করেছে র্যাব-৩ সদস্যরা। তবে পরকীয়ার সাথে যুক্ত তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনাকে গ্রেফতার করতে পারেনি র্যাব।
র্যাবের প্রথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার হেলেনা বেগম ও তার মেয়ে তাসলিমা জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সৌদি প্রবাসী মোকাররমের সাথে একই গ্রামের বাসিন্দা সৌদি প্রবাসী সুমনের সুসম্পর্ক। সম্পর্কের জেরে মোকাররম সৌদি থাকাকালীন সময়ে সুমনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনার সাথে পরিচয়। এরপর মোবাইলে কথপোকথন। সেখান থেকে সম্পর্ক। একপর্যায়ে ভিডিও-অডিও কলে আপত্তিকর কথা ও ছবি-ভিডিও আদান-প্রদান করা হয়। এরপর হাসনাকে বিভিন্ন সময়ে পাঁচ লক্ষাধিক টাকাও দেন মোকাররম। গত ১৩ মে মোকাররম গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানকে না জানিয়ে হজরত শাহজালাল (রহ:) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে ট্রেনে কমলাপুর হয়ে তাসলিমা আক্তারের সাথে দেখা করতে তাসলিমার বান্ধবী হেলেনা আক্তারের ভাড়া বাসা মাণ্ডা এলাকায় যান। কিন্তু মোকাররম জানতেন না যে সেখানেই তার জীবনের ইতি টানতে হচ্ছে। পরকীয়ার জেরে নৃশংসভাবে হত্যার পর তার লাশের সাত টুকরো একটি পলিথিনের ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলা হয়। মস্তকটি ফেলা হয় আরেকটি জায়গায়।
র্যাব জানায়, এমন নৃশংস ঘটনায় রাজধানীসহ সারা দেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। চাঞ্চল্যকর এই হত্যার সাথে জড়িত হেলেনা বেগম ও তার মেয়ে হালিমা আক্তারকে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক ঘটনার আদ্যোপান্ত।
র্যাব-৩-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, গত ১৩ মে সৌদি থেকে মোকাররম নিজ বাড়িতে না জানিয়ে মাণ্ডায় তাসলিমার বান্ধবী হেলেনা আক্তারের ভাড়া বাসায় যান। ওই বাসায় হেলেনা দুই মেয়েসহ থাকেন। হেলেনার এক রুমের বাসায় তাসলিমা ও মোকাররম ঘুমাতে যান। আর হেলেনা তার দুই মেয়ে একই রুমে থাকেন। এ সময় মোকাররমের সাথে তাসলিমার মনোমালিন্য হওয়ায় ওই রাতেই হেলেনার নাবালিকা মেজো মেয়ে হালিমার সাথে মোকাররমের অসামাজিক কার্যকলাপের চেষ্টা করার সময় হেলেনা দেখে ফেলেন। তাসলিমা ও মোকাররমের সাথে বিয়ের কথাবার্তা নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া লাগে এবং মোকাররম তাসলিমাকে বিয়ে করতে চাইলে তাসলিমা বিয়ে করতে অস্বীকার করে। তাসলিমাকে দেয়া পাঁচ লাখ টাকা ফেরত ও তাসলিমার নিজস্ব মোবাইল থেকে অসামাজিক ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়। এসব তাসলিমার সাথে ঝগড়া অপর দিকে হালিমার মেয়ের সাথে অসামাজিক কার্যকলাপেরর কারণে ক্ষোভ সৃষ্টি। এতে তাসলিমা হেলেনাকে সাথে নিয়ে মোকাররমকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তাদের দু’জনের পরিকল্পনায় পরের দিন সকালে নাশতার সময় মোকাররমকে পানির সাথে ঘুমের ওষুধ খাওয়ায়। পানি তিতা লাগায় মোকাররম পুরো পানি শেষ না করতেই ঘুমের ঘোর এলে হেলেনা মোকাররমকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে মারার চেষ্টা করে। মোকাররম প্রাণে বাঁচার জন্য হেলেনাকে হাতে কামড় দিয়ে ফেলে দিয়ে গলাচেপে ধরে। তখন তাসলিমা মোকাররমকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করলে মোকাররম তাসলিমার হাত থেকে হাতুড়িটি ছিনিয়ে নিয়ে তাসলিমাকে আঘাত করার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে হেলেনা পাশে থাকা বটি দিয়ে মোকাররমের গলায় এক কোপ দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয় এবং মেজো মেয়ে হালিমা মাটিতে পড়ে থাকা হাতুড়ি দিয়ে মোকাররমের মাথায় একটি আঘাত করে। পরে তাসলিমা বটি দিয়ে আরো তিন-চারটি আঘাত করে। সবাই মিলে মোকাররমের মৃত্যু নিশ্চিত করে লাশ বাথরুমে নিয়ে যায়। তারপর রক্তমাখা ঘর পরিষ্কার করে। ওই ঘটনার পর সবাই মিলে বাইরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য কিছু সময় বাইরে ঘোড়াফেরা করে। ফের বাসায় এসে লাশ আটটি খণ্ড করে পলিথিন ও বস্তায় ভরে তাদের বাথরুমে রেখে দেয়। পরে লাশ প্রায় ১২ ঘণ্টা পলিথিনে রাখার পর রাত সাড়ে ১১টায় সুযোগ বুঝে আট টুকরা করা লাশ ভর্তি পলিথিনে সাত টুকরা তারা অন্ধকারে ভাড়া বাসার বিল্ডিংয়ের নিচে ময়লার স্তূপে ফেলে দেয় এবং মাথার অংশ বাসা থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে ফেলে দিয়ে আসে।
পরের দিন ১৫ মে তারা সবাই মিলে বাইরে ঘুরতে যান এবং হোটেলে গিয়ে বিরিয়ানি খেয়ে আসে। বাসায় আসার পর তারা রাতে ছাদে গিয়ে পার্টি করে এবং ওই পার্টিতে প্রতিবেশীদেরকেও অংশগ্রহণের জন্য অনুরোধ করে। ১৬ মে শনিবার তাসলিমা আক্তার তার ছোট্ট ছেলে আহনাফকে নিয়ে তাদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে চলে যায় এবং ১৭ মে হেলেনা ভীত অবস্থায় তার দুই মেয়েকে নিয়ে কাজে যোগদান করে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরত আসে। কিন্তু ১৭ মে দুপুরে লাশ থেকে পঁচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় তা এলাকাবাসীর চোখে পড়ে এবং তারা ৯৯৯ এ কল করে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশের টুকরাগুলোকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। পরবর্তীতে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে এনআইডি শনাক্ত করে লাশটির পরিচয় পাওয়া যায়। র্যাব সদস্যরা হেলেনা আক্তার ও তার মেজো মেয়ে হালিমাকে গ্রেফতার করার পর হেলেনার দেয়া তথ্য অনুযায়ী মোকাররমের মাথার অংশ উদ্ধার করা হয়।
নিহত মোকাররম মিয়ার চাচাতো ভাই মো: রিফাত জানান, আমরা গতকাল বিকেলে ভাইয়ের লাশ পুলিশের কাছ থেকে বুঝে পাই। লাশ গ্রামে নিয়ে নামাজে জানাজার পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। মোকাররম আশুগঞ্জ উপজেলার সোহরাব মিয়ার ছেলে। তার স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে।



