নানা আইন-কানুন, কড়াকড়ির পরও পবিত্র হজকে কেন্দ্র করে বেসরকারি এজেন্সি মালিকদের অনিয়ম-হয়রানি ঠেকানো যাচ্ছে না। নুসুক মাসার সিস্টেমে সময়মতো হজযাত্রীদের ডাটা এন্ট্রি না করা, পরিবহন চুক্তি না করা, অনুমতি ছাড়া অন্য ব্যক্তিকে রিপ্লেস, ভিসাপ্রাপ্ত হজযাত্রীর নিবন্ধন বাতিল, বিদেশ থেকে সৌদিতে সরাসরি হজযাত্রী পাঠানো এসব অনিয়মের মধ্যে অন্যতম। অনিয়ম রোধে প্রতি বছর এজেন্সিগুলোকে শাস্তি দিয়ে থাকে ধর্ম মন্ত্রণালয়। কিন্তু কোনোভাবেই অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
খোয়াই এয়ার ট্রাভেলস। রাজধানীর ফকিরাপুলের এ বেসরকারি হজ এজেন্সি নির্ধারিত সময়ে মক্কা-মদিনায় বাড়িভাড়া সম্পন্ন করেনি। একইভাবে অনেক হজযাত্রীর ভিসাও সঠিক সময়ে করেনি সংস্থাটি। তারপরও এ বছর হজকার্যক্রমের অনুমতি পায় এ এজেন্সি। এ বছরও এজেন্সিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সৌদি আরবের নুসুক মাসার সিস্টেমে হজযাত্রীদের ডাটা এন্ট্রি করেনি। একইভাবে পরিবহন চুক্তি না করা, হজযাত্রীর অনুমতি ছাড়া অন্য ব্যক্তিকে রিপ্লেস করা এবং ভিসা হয়ে যাওয়ার পরও দুই হজযাত্রীর নিবন্ধন বাতিল করার মতো গুরুতর অনিয়ম করেছে এজেন্সিটি। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ধর্ম মন্ত্রণালয় শাস্তি দিয়েছে খোয়াই এয়ার ট্রাভেলসকে। আগামী দুই বছর তাদের হজকার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
হজে রিপ্লেসমেন্টের ক্ষেত্রে সব সময় অভিযোগ পাওয়া যায়। এ বছরের হজও তার ব্যতিক্রম নয়। নিবন্ধন করা হজযাত্রী মৃত্যুবরণ বা গুরুতর অসুস্থ হলে তবেই সরকারের অনুমতি নিয়ে শূন্য কোটায় প্রাক-নিবন্ধনের ক্রম মেনে নতুন ব্যক্তিকে প্রতিস্থাপন করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু রিলেশন ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস, এফ এম ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, ফিহা ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস, মীর আমেনা ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস, শীতলক্ষ্যা ট্রভেলস এবং আনসারী ওভারসিজ এসব নিয়ম লঙ্ঘন করে হজযাত্রী প্রতিস্থাপন করেছে। এর মধ্যে মীর আমেনা ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের বিরুদ্ধে বগুড়ার রুনা লায়লা মিতু নামে একজন অভিযোগ করেন, হজ নিবন্ধন করা তার স্বামী মারা যাওয়ার কারণে মাহরাম হিসেবে তার ভাগ্নেকে প্রতিস্থাপন করে দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু এজেন্সি তার আবেদনে কোনো সাড়াই দেয়নি।
এবার মাত্র ৩০টি লিড এজেন্সি হজযাত্রী পাঠাচ্ছে হজে। প্রতি লিড এজেন্সির মাধ্যমে অনেকগুলো এজেন্সির হজযাত্রীরা হজে যাচ্ছেন। নিয়মানুযায়ী যেসব এজেন্সির হজযাত্রী যাচ্ছে তাদের আপডেট তথ্য সরবরাহ করবে লিড এজেন্সি। কিন্তু নামিরা ট্র্যাভেলস এর ধার ধারছেনা। রিমাল ট্র্যাভেলস অভিযোগ করেছে নুসুক এবং পিআরপি সিস্টেমের কোন ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দিচ্ছে না লিড এজেন্সি। এ ছাড়া বাড়িভাড়া ও ভিসার কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা, নির্ধারিত সময়ে হোটেল রিকোয়েস্ট ও ভাউচার পেমেন্ট না দেয়াসহ কোনো ধরনের সহযোগিতা করছে না লিড এজেন্সি নামিরা ট্র্যাভেলস।
হজ প্যাকেজ ও গাইডলাইন ২০২৬ এর ১৩ (১৫) অনুযায়ী ‘বাংলাদেশের হজকোটায় ভিসা গ্রহণকারী কোনো হজযাত্রী ভিন্ন দেশ হতে সরাসরি সৌদি আরবে প্রবেশ করতে পারবে না। কিন্তু লিড এজেন্সি মিডিয়া সার্ভিসেস লিমিটেড ও এর সময়ন্বকারী এজেন্সিগুলো ১২২ জন হজযাত্রী বিদেশ থেকে সরাসারি সৌদি আরবে পাঠিয়েছে। এভাবে একের পর এক অনিয়ম করে যাচ্ছে বেসরকারি এজেন্সি মালিকরা। বিভিন্ন সময় তাদের শাস্তি দেয়ার পরও কোনোভাবেই হজযাত্রীদের সাথে প্রতারণা ঠেকানো যাচ্ছে না।
হজকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। হজ ফ্লাইট শুরু হওয়ার পর থেকেই আশকোনা হজক্যাম্পে গিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত কার্যক্রম পরিদর্শন ও বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন মন্ত্রী। হজের শুরুতেই তিনি এজেন্সি মালিকদের কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি না করার জন্য কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। হাজীদের সেবায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও কড়া বার্তা দিয়েছেন তিনি। সৌদি আরবে গিয়েও নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ধর্মমন্ত্রী। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মক্কায় হজযাত্রীদের সেবায় স্থাপিত মেডিক্যাল সেন্টার পরিদর্শন করেন তিনি। মন্ত্রী কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীদের সাথে কথা বলেন এবং হজযাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের জন্য অনুরোধ জানান। এ সময় হজ মেডিক্যাল টিমের সদস্যদের উদ্দেশে ধর্মমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হজযাত্রীদের সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি হজযাত্রীদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন। এ সময় তিনি হজসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করে বলেন, দায়িত্বে অবহেলা করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। যারা শুধু সৌদি আরবে এসে ঘুরে বেড়াবে কিন্তু দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। হজযাত্রীদের আন্তরিকভাবে ও নিষ্ঠার সাথে সেবা প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুরস্কৃত করা হবে বলেও ঘোষণা দেন ধর্মমন্ত্রী। এর আগে বাংলাদেশ হজ মিশন অফিসে এসে সংবাদ ব্রিফিংয়ে হজযাত্রীদের সর্বোত্তম সেবা প্রদানের বিষয়ে হজ টিমের সদস্যদের নির্দেশ দেন ধর্মমন্ত্রী। দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন বা অবহেলা পরিলক্ষিত হলে সংশ্লিষ্ট সদস্যের ভ্রমণ সুবিধাদি কর্তন করা হবে বলে জানান তিনি।



