অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
বেশ কিছুদিন ভালো অবস্থা পার করলেও সম্প্রতি নেতিবাচক প্রবণতার শিকার হচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার। গত সপ্তাহে ৫ কর্মদিবসের মধ্যে দু’টি সূচকের নামমাত্র উন্নতি ঘটলেও তিনটিতে অবনতি ঘটে। এর ফলে মাত্র এক সপ্তাহেই বাজার মূলধনের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা হারায় দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। হঠাৎ করে বাজারের এই নেতিবাচক প্রবণতার কারণে বিনিয়োগকারীসহ স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সামনের দিনগুলোতে বাজার কেমন যাবে তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। কারণ ইদানীং বাজার যেকোনো অজুহাতে ধারাবাহিক অবনতির খপ্পরে পড়ে। ফলে অস্থিরতা তৈরি হয় সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে।
গত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি ৯৬ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। গত রোববার ৫ হাজার ৯০০ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট থেকে সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি গত বৃহস্পতিবার নেমে আসে ৫ হাজার ৮০৪ দশমিক ৩০ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিষেশায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৯১ ও ২২ দশমিক ৮১ পয়েন্ট।
সূচকের অবনতির ফলে গত সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধনের বড় ধরনের অবনতি ঘটে। এ সময় পুঁজিবাজারটি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা মূলধন হারায়। সপ্তাহান্তে ডিএসইর মূলধন দাঁড়ায় ৭ লাখ ১ হাজার ২৭০ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ বা ৯ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা কম। আগের সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল সাত লাখ ১০ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা।
সূচকের সাথে অবনতি ঘটেছে ডিএসই লেনদেনেও। গত সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেন ছিল পাঁচ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। আগের সপ্তাহে মোট লেনদেন ছিল সাত হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।
এ দিকে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা হঠাৎ বাজারের নেতিবাচক আচরণের কারণ হিসাবে দু’টি উপসর্গকে দায়ী মনে করছেন। তাদের মতে, প্রথমত মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ আগামীতে কোন দিকে মোড় নেয় তা কেউ জানে না। এর আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পতনের শিকার ছিল পুঁজিবাজার। ওই সময় বিএসইসি ও ডিএসইর নেয়া বিভিন্ন চেষ্টা সত্ত্বেও ইতিবাচক ধারায় ফিরেনি বাজার। এর আগে ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে একইভাবে দীর্ঘদিন ভুগতে হয়েছে পুঁজিবাজারকে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের এ যুদ্ধ কোন দিকে মোড় নেয় তা নিয়ে শঙ্কিত বিনিয়োগকারীরা। এতে বাজারে বিক্রয়চাপ বাড়ছে। তবে তারা আশাবাদী, যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি রূপ না নিয়ে শিগগিরই বাজার ঘুরে দাঁড়াবে। আর যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় নেবে।
এ ছাড়া আরেকটি উপসর্গ হলো মার্জিন রুলস। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া কমিশন পুঁজিবাজার সংস্কারের অংশ হিসেবে মার্জিন রুলসে সংশোধন করে নতুন বিধি তৈরি করলেও সম্প্রতি দায়িত্ব পাওয়া কমিশন এতে সংশোধনী আনে। বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিমুক্ত করার লক্ষ্যে নীতিমালায় এই সংশোধনী আনা হয়েছিল। কিন্তু নতুন কমিশন মার্জিন রুলসকে বিনিয়োগবান্ধব করার জন্য আগের নীতিমালায় পরিবর্তন আনে। ইতোমধ্যে বিএসইসি জনমত যাচাইয়ের জন্য কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে তা প্রকাশ করে। কিন্তু সংশোধিত এ বিধিমালা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাই বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বিক্রয়চাপ বৃদ্ধি করেছেন।
গত সপ্তাহের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায় বাজারের ২২টি খাতের মধ্যে মাত্র তিনটি খাতেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। বাকি ১৯টি খাতে শিকার ছিল দরপতনের। মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া তিনটি খাত ছিল মিউচুয়াল ফান্ড, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও টেক্সটাইলস। অন্য দিকে সবচেয়ে বেশি দরপতনের শিকার হয়েছে বীমা খাত। সপ্তাহের শেষ দুই দিন ব্যাপকভাবে দর হারায় খাতটি। বাকি ১৮টি খাতের সবগুলোতে কমবেশি দরপতন ঘটে।
গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে ছিল মালেক স্পিনিং মিলস। প্রতিদিন গড়ে ২৫ কোটি ৯০ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয় কোম্পানিটির। গড়ে ২২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা বেচাকেনা করে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল টেকনোড্রাগস। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আইটি কনসালট্যান্ট, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, আইপিডিসি, সিটি ব্যাংক, ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, লঙ্কা বাংলা ফিন্যান্স ও ব্র্যাক ব্যাংক।
বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানির শীর্ষে ছিল এমএল ডাইং। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া শাশা ডেনিম ছিল দ্বিতীয় স্থানে। মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে তাক্বাফুল ইন্স্যুরেন্স, এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং, প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, মালেক স্পিনিং, প্রভাতি ইন্স্যুরেন্স ও দেশবন্ধু পলিমার।



