‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য’

Printed Edition
‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য’
‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য’

ড. আশরাফ পিন্টু

‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু’

বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব অনেকটা ধূমকেতুর মতো। একাধারে অপ্রত্যাশিত, অভিনব সুন্দর কিন্তু ভয়ঙ্কর। আমাদের কাছে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত। সমাজের যেখানে তিনি দেখেছেন শোষণ ও অবিচার, স্বার্থে স্বার্থে সঙ্ঘাত, বোধে ক্ষুদ্রতা ও নীচাশয়তার পরিচয়, রাষ্ট্রীয় জীবনে যেখানে দেখেছেন পশুশক্তির উন্মত্ততা ধর্মীয় জীবনে মুখোশধারী মানুষের ভণ্ডামি, সেখানেই তিনি সৃষ্টি করেছিল দাবানল-দাহ, করেছেন বিদ্রোহ।

নজরুলের বিদ্রোহের মধ্যে ধ্বংসের জয়গানেই শুধু নয়, সৃষ্টির প্রত্যক্ষ আহ্বানও রয়েছে। নারীর মুক্তি, শ্রমজীবী জনতার মুক্তি, ধর্মের গোঁড়ামি ও অন্ধতার থেকে মুক্তিই কবির লক্ষ্য। বর্তমান গলিত সমাজকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে মানুষের পূর্ণ বিকাশের জন্য একটি সুস্থ সুন্দর সমাজ গঠনই তার উদ্দেশ্য। সে সমাজে সবার সমান অধিকার থাকবে, ধনী দরিদ্রের প্রভেদ থাকবে না, উৎপাদনের রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হবে সামাজিক অধিকার। এ সত্যকে উপলব্ধি করেই তিনি প্রচলিত সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করেন।

‘জনগণে যারা জোঁক সমশোষে তারে মহাজন কয়

সন্তান সম পালে যারা জমি, তারা জমিদার নয়।’

বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক পটভূমিতে দেখা যায়, নজরুল ইসলামই একমাত্র কবি যিনি পরিপূর্ণভাবে নিজেকে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাই তার কাব্যে দেখা যায় ভারতবর্ষের দুই প্রধান জাতি হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের আদর্শবোধ ও ঐতিহ্যের সমন্বয় সাধন। তিনি উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন।

‘হিন্দু ওরা মুসলিম? জিজ্ঞাসে কোন জন

কাণ্ডারি, বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা-র’।

তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিল, যেখানে মানুষের পরিচয় শুধু মানুষ হিসাবেই। তাই তার মুখে ধ্বনিত হয়েছে-

গাহি সাম্যের গান

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সববার ব্যবধান।

যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ মুসলিম ক্রীসচান।

নজরুল যেমন বিদ্রোহী/তেমনি প্রেমিকও। কেননা যিনি প্রেমিক নন, তিনি প্রাণহীন আর যার প্রাণ নেই তিনি কখনো বাঁচবার তাগিদ অনুভব করেন না। কেননা কঠোরতা ও কোমলতার সম্মেলনেই গড়ে ওঠে সজীবতা। তাই নজরুলের যেগুলো প্রেমের কবিতা নয়, সেগুলোতেও এক ভিন্নধর্মী রোমান্টিক মানসের পরিচয় পাওয়া যায়-

‘আমি বন্ধনহারা কুমারীর বেণী, তন্বী নয়নের বহ্নি

আমি ষোড়শীর হৃদে সরসিজ প্রেম-উদ্দাম আমি ধন্যি’

নজরুল ইসলাম একজন আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ তাই তো তার কবিতায় পাওয়া যায় অগ্রগামী চিন্তা চেতনার বাণী। যখন চাঁদের মাটিতে মানুষের পা পড়েনি, মঙ্গল গ্রহে নভোযান পাঠানোর কথা কেউ চিন্তাও করেনি, তখন তিনি লিখেছেন-

‘হাউই চড়ে চায় যেতে কে চন্দ্রলোকের অচিনপুরে,

শুনবো আমি ইঙ্গিত কোন মঙ্গল হতে আসছে উড়ে।’

যেহেতু নজরুল ইসলাম ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক ও সংস্কারমুক্ত একজন আধুনিক কবি; তাই তিনি বাঙালির জাতির জড়তাকে কটাক্ষ করেছেন তীব্রভাবে, বিশেষ করে মুসলমান সমাজের ধর্মীয় গোঁড়ামি আর অন্ধতা কিভাবে আমাদের চিন্তাচেতনাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে, কিভাবে এই অন্ধ মোল্লা-মৌলবিদের কারণেই মুক্তবুদ্ধির চর্চা রহিত হচ্ছে। মুসলমানরা এগিয়ে যাওয়ার বদলে পিছিয়ে যাচ্ছে, তারই ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে আলোচ্য কবিতাংশে-

‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখন বসে

বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজি ফেকা-হাদিস চষে।’

নজরুল ইসলাম একাধারে বিদ্রোহী, সাম্যবাদী অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক, নারীবাদী, নিপীড়িত নির্যাতিতের কবি হলেও তার কবি মানসে মূলত প্রধান দু’টি সত্তা লক্ষ করা যায়; তা হলো বিদ্রোহ ও প্রেম। নজরুলের মধ্যে রোমান্টিসিজম রিফরমেশন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তীব্র বাস্তবতাবোধে ও দীপ্ত বিদ্রোহের মধ্যেও নজরুল রোমান্টিক চিন্তাকে পরিত্যাগ করতে পারেননি। তাই তার বিদ্রোহী কবিতার ভাষা যেমন অদম্য প্রেমের কবিতার ভাষাও তেমনি চোখের জলে সিক্ত। এ যেন একই আকাশ থেকে উৎসারিত দু’টি ধারা কখনো সূর্যের তীব্রদাহ আবার কখনো স্নিগ্ধ চাঁদের মনোরম জোসনা। মূলত বিদ্রোহ কবিতার এই লাইনের মধ্যেই তার কবিমানস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-

‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী

আর হাতে রণতূর্য’।