এস এম মিন্টু
‘ডিজিটাল রাষ্ট্র’ বা ‘স্মার্ট রাষ্ট্র’ গঠনের জোয়ার বিশ্বজুড়ে বইছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের ল্য নিয়ে দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এর পেছনের মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দেশের স্পর্শকাতর ডাটা, সরকারি সফটওয়্যার এবং কাউড কম্পিউটিং ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে বিদেশী প্রযুক্তি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মাত্রাতিরিক্ত বিদেশী নির্ভরতা দেশের জাতীয় নিরাপত্তা এবং ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব’কে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নাগরিক সেবা সহজ করা, দুর্নীতি কমানো এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা আনার প্রতিশ্রুতিতে ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা হলেও এই চকচকে পর্দার আড়ালে ভয়াবহ এক বাস্তবতা ডালপালা মেলছে, যার নাম ‘ডেটা রাজনীতি’। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ‘ফোরথ টায়ার’ জাতীয় ডাটা সেন্টার রয়েছে। তবে সমতা ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং ব্যাকআপের প্রয়োজনে বাংলাদেশ ক্রমেই বিদেশী কাউড সার্ভারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য আজ শুধু সেবার মাধ্যম নয়, বরং ভূরাজনীতি, করপোরেট মুনাফা এবং নজরদারির সবচেয়ে বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। নাগরিকের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, আঙুলের ছাপ, আইরিশ স্ক্যান, মুঠোফোন নম্বর, আর্থিক লেনদেন এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের অভ্যাস সংক্রান্ত সব তথ্য সংগ্রহ করে সেই ডেটা চলে যাচ্ছে সাইবার অপরাধীদের কাছে। ডিজিটাল প্রতারণার শিকার হয়ে লাখ লাখ মানুষ বছরের পর বছর তদন্তের জালে আটকে আছেন। আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী প্রতিশ্রুতি দিলেও পুলিশের নিজস্ব কার্যকর সাইবার অপরাধ দমনের যন্ত্রপাতি না থাকায় খোদ পুলিশ সদস্যরাও এখন ভুক্তভোগী।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিজিটাল অপরাধসংক্রান্ত লাখ লাখ অভিযোগ পুলিশের সবগুলো ইউনিটে জমা পড়েছে। তার মধ্যে ১ শতাংশও সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, দক্ষ জনবলের পাশাপাশি সক্ষমতাও নেই ইউনিটগুলোর কাছে।
গোয়েন্দাদের একাধিক সূত্র জানায়, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যে দুর্নীতি হয়েছে, তার মধ্যে সাইবার সিকিউরিটির সরঞ্জাম কেনাকাটায়ও ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে। ওই সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের প্রথম দিকে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) হোয়াটসঅ্যাপ কল রেকর্ডের জন্য এইডজেস (ইডিজিএস) প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১৫০ কোটি টাকার ডিভাইস কেনা হয়। প্রতিষ্ঠানের মালিক হাসান যে ডিভাইস সাপ্লাই দিয়েছে তা আর ব্যবহার করতে পারেনি এনটিএমসি। মূলত ভূয়া বা নষ্ট ডিভাইস ডেলিভারী দিয়ে হাসান দুবাই গিয়ে অবস্থান করছেন। ফলে সেই ডিভাইসগুলো আর আলোর মুখ দেখেনি। সরকারেরও ১৫০ কোটি টাকা পানিতে গেছে। শুধু এমটিএমসি নয়, এমন ভোগান্তির শিকার হয়েছে এলিট ফোর্স র্যাব, কাউন্টার টেরেরিজম ইউনিট (সিটিটিসি), সিআইডি ও ডিবি পুলিশ।
ফেসবুক বা মেটার অফিস নেই বাংলাদেশে : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক। ফেসবুকের মূল নিয়ন্ত্রক হলো মেটা। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করলেও ফেসবুক বা মেটার বাংলাদেশে কোনো অফিস নেই। এই মাধ্যমে কেউ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে ভারতের মেটার অফিসের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। আগে র্যাবের সদস্যরা ভারতের মেটা অফিস থেকে সহযোগিতা পেতেন। র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ভারতে অবস্থানরত মেটার কাছ থেকে আর সহযোগিতা পাচ্ছে না। ফলে বর্তমানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অর্থ পরিশোধের বিনিময়ে অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত বা চিহ্নিত করতে হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (মন্ত্রীর একান্ত সচিব) মোহাম্মদ মোকলেছুর রহমান গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, সাইবার নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি আমরা অবগত। তবে আমার জানা মতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে একটা যোগাযোগ আমাদের মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের যোগাযোগ আছে। এ বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন সংশ্লিষ্ট দফতর।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্ত বিভাগের যুগ্মসচিব (আইসিটি প্রমোশন ও গবেষণা অনুবিভাগ) ড. মো: তৈয়বুর রহমান গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা মূলত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ৯০ শতাংশ হ্যাকিং প্রটেকশনের কাজগুলো করি। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে হ্যাকারদের নজর বেশি থাকে। তিনি বলেন, আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসলে সংশ্লিষ্টদের কাছে (মেটা, ওয়াটসঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) তথ্য প্রমাণসহ অভিযোগগুলো পাঠানো হয়। এখন পর্যন্ত যেসব অভিযোগ পাঠানো হয়েছে তার ৫০ শতাংশের বেশি অভিযোগ সমাধান করা হয়েছে। সাইবার প্রটেকশনের সক্ষমতা এবং দক্ষ লোক না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে জনবল ও মেশিনারিজ না থাকায় তারা আমাদের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করছে। আমরাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি।
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, ডিজিটাল অপরাধীদের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে ততটা জনবল আমাদের নেই। আমরা নীতিগতভাবেই সারা দেশে সাইবার ক্রাইমের প্রতিরোধ হিসেবে শাখা করার পরিকল্পনা করছি। তিনি বলেন, সরকারে কাছে আবেদন করেছি। প্রস্তাবে প্রতি জেলায় একজন এসপির মাধ্যমে সাইবার ইউনট করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আমাদের প্রতি থানায় থানায় সাইবার ইউনিট করার পরিকল্পনা আছে। কারণ এক জেলার অপরাধী আরেক জেলায় প্রতারণার শিকার হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পুলিশে বর্তমানে ৮টি রেঞ্জের অধীনে ৬৪টি জেলা পুলিশ, ৮টি মেট্রোপলিটন পুলিশ, সিআইডি, পিবিআই ইত্যাদিসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট মামলা তদন্তসহ দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রার দায়িত্ব পালন করে থাকে। মানুষের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা রা এবং ফৌজদারি মামলার তদন্তের মূল দায়িত্ব বাংলাদেশ পুলিশের ওপর ন্যস্ত। এ েেত্র তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির ফলে বহুমাত্রিক সাইবার অপরাধের সংখ্যাও প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৃদ্ধির প্রভাব বহুমাত্রিক। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার, রাষ্ট্রবিরোধী গুজব ছড়ানো, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে হ্যাকিং, পর্নোগ্রাফি, বহুমাত্রিক সাইবার অপরাধ, এমনকি রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসের মতো ঘটনাগুলো জরুরি ও জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। কিন্তু দ জনবলের অভাবে অনুসন্ধান সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন সম্ভব হয় না। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের কিছু ইউনিট সাইবার অপরাধের তদন্তে কাজ করলেও তা অপ্রতুল এবং কেন্দ্রীভূত। রাজধানীর বাইরের বিভাগীয়, জেলা ও থানা পর্যায়ের জনগণ এ সেবা থেকে প্রায়ই বঞ্চিত হচ্ছেন।
ডেটা ফাঁসের ভয়াল বাস্তবতা : আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ডেটা ফাঁসের বেশ কিছু বড় ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র সার্ভার, সরকারি বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সার্ভার হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে। কোটি কোটি নাগরিকের সংবেদনশীল তথ্য উন্মুক্ত ইন্টারনেটে বা ডার্ক ওয়েবে চলে গেছে। এই ডেটা ফাঁসের সুযোগে সাধারণ মানুষ নানামুখী সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন। কোন সিম বা ওটিপি চুরির মাধ্যমে ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া, চরিত্র হননকারী পোস্ট এবং গুজব ছড়িয়ে দেশে-বিদেশে আতঙ্ক তৈরি করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। পুলিশের স্বতন্ত্র কোনো সাইবার ইউনিট নেই। কিছু বিশেষজ্ঞ পুলিশ সদস্য দিয়ে ছোট পরিসরে কাজ চললেও লাখ লাখ অভিযোগ পড়ে আছে অনিষ্পন্ন। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরাও ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়ছেন।
আইনি কাঠামো সংস্কার : বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পরিবর্তন করে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে সাইবার অপরাধ দমন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো সুরায় জোর দেয়া হয়েছে। নাগরিকদের তথ্যের সুরায় ‘উপাত্ত সুরা আইন’ চূড়ান্তকরণের কাজও চলছে। সাইবার স্পেস সার্বণিক নজরদারি এবং যেকোনো ধরনের সাইবার হামলা প্রতিরোধে এই এজেন্সি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো ঘোষণা : বাংলাদেশ ব্যাংক, নির্বাচন কমিশন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসহ প্রায় ৩৪টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষণা করে বিশেষ অডিট ও নজরদারি চালানো হচ্ছে। কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (সিআইআরটি) সরকারি এই টিমটি সাইবার হুমকির পূর্বাভাস দেয়, হ্যাকিংয়ের ঘটনা তদন্ত করে এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান করে।
দুর্বলতা যেখানে : সরকারি উদ্যোগ সত্ত্বেও সাইবার সুরায় বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। দেশের সাইবার নিরাপত্তা খাতে দ বিশেষজ্ঞের চরম সঙ্কট রয়েছে। অধিকাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানে ডেটা সুরার জন্য নিবেদিত আইটি টিম নেই। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় এখনো পাইরেটেড বা মেয়াদোত্তীর্ণ সফটওয়্যার ব্যবহার হচ্ছে, যা হ্যাকারদের জন্য পথ খুলে দিচ্ছে। এ ছাড়া হ্যাকিং বা ডেটা ফাঁসের ঘটনা ঘটলে প্রতিষ্ঠানগুলো তা চেপে রাখার চেষ্টা করে। বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের ঘাটতিও স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল রাষ্ট্রের সুফল পেতে হলে ডেটা রাজনীতিকে রুখতে হবে এবং সাইবার নিরাপত্তাকে জাতীয় প্রতিরার সমক বিবেচনা করতে হবে। এমন আইন পাস করতে হবে যা করপোরেট ও রাষ্ট্র উভয় প থেকে নাগরিকের তথ্যের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করবে। নাগরিকের ডেটা তার অনুমতি ছাড়া কোথাও ব্যবহার করা যাবে নাÑ এই নিশ্চয়তা দিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বাজেটের একটি বড় অংশ। শুধু সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো আধুনিকায়নে বরাদ্দ করতে হবে। পাশাপাশি সাইবার অপরাধীরা আন্তর্জাতিক সীমানা মানে না। তাই বৈশ্বিক সাইবার প্রতিরা সংস্থাগুলোর সাথে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
এইক্ষেত্রে প্রতিটি নাগরিককে নিজের ডেটা সুরায় সচেতন হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবহারে সতর্কতাই প্রথম প্রতিরোধ। প্রযুক্তির অগ্রগতি রুখে দেয়া সম্ভব নয়, আর তা কাম্যও নয়।



