ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে বিশ্বের কোম্পানিগুলোর ক্ষতি ন্যূনতম আড়াই হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং প্রতিদিনই তা উত্তরোত্তর বাড়ছে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার অসংখ্য কোম্পানির বিবৃতি ও আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এ পর্যালোচনা করা হয়েছে।
এতে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানির বাড়তি মূল্য, সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিঘœ এবং বাণিজ্যপথ বন্ধ থাকায় ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানকেই এখন তাদের ব্যবসা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলার চালানোর পরপরই ইরান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌ-বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালীর পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব নিয়ে নিয়েছে; যে কারণে এখন তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো নৌযানই ওই সঙ্কীর্ণ জলপথটি পার হতে পারছে না।
পশ্চিম এশিয়ায় এ যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট লোকসান কমাতে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হওয়ার কথা জানিয়েছে বিশ্বের অন্তত ২৭৯টি কোম্পানি। এদের অনেকে তাদের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে কিংবা উৎপাদন কমিয়েছে। কেউ লভ্যাংশ দেয়া বন্ধ করেছে, কেউ শেয়ার পুনঃক্রয় স্থগিত রেখেছে। অনেকেই কর্মীদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে, যোগ করেছে জ্বালানি সারচার্জ। কিছু কোম্পানিকে আবার সরকারের কাছে জরুরি সহায়তাও চাইতে হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারী এবং ইউক্রেইনে রাশিয়ার ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ পর ইরান যুদ্ধ যে বৈশ্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যে আরো অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এ যুদ্ধ সহসা থামছে না বলেও ধারণা অনেক কোম্পানির। ‘ব্যবসাবাণিজ্যে ক্ষয়ক্ষতির যে মাত্রা তার সাথে (২০০৮ সালের) বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সঙ্কটের তুলনা হতে পারে। অন্যান্য মন্দার সময়ের চেয়েও এবারের ক্ষতির পরিমাণ বেশি,’ বলেছেন ওয়ার্লপুলের প্রধান নির্বাহী মার্ক বিটজার। তার কোম্পানি এবার পুরো বছরের আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে, লভ্যাংশ দেয়াও স্থগিত রেখেছে।
প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি কোম্পানিগুলোর পক্ষে এখন দাম বাড়ানো বা নির্ধারিত খরচ সামাল দেয়াও কঠিন হয়ে পড়বে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন। এতে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মুনাফা অনেকটাই কমে যেতে পারে। দাম বাড়ালে তা মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে এবং ক্রেতাদের আস্থাও দুর্বল করে দিতে পারে। ‘ক্রেতারা এখন নতুন পণ্য না কিনে আগের পণ্যই মেরামত করে নিচ্ছেন,’ বলেছেন বিটজার। প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল (পিঅ্যান্ডজি), মালয়েশিয়ার কনডম নির্মাতা কারেক্স এবং টয়োটার মতো অনেক বড় বড় কোম্পানিই উৎপাদন খরচ বাড়ায় তাদের পণ্যের দাম বাড়তে যাচ্ছে বলে আগেভাগে জানিয়ে দিয়েছে।
হরমুজ প্রণালীতে ইরানের বিধিনিষেধে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যুদ্ধের আগের চেয়ে এ দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জলপথটি আটকে থাকায় নৌপরিবহনের খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনি কাঁচামাল সরবরাহও কমেছে। সার, হিলিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম ও পলিইথিলিন সরবরাহ সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে।
পর্যালোচনায় কসমেটিক্স থেকে শুরু করে টায়ার, ডিটারজেন্ট ও বিলাসবহুল প্রমাদতরী পর্যন্ত সব কোম্পানিই স্থান পেয়েছে। এ কোম্পানিগুলোর প্রতি ৫টির একটিই যুদ্ধে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে নিয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের অনেক কোম্পানিই জ্বালানির উচ্চমূল্যকে তাদের ক্ষতির পেছনের মূল কারণ হিসেবে হাজির করছে। ক্ষতির কথা স্বীকার করা কোম্পানিগুলোর এক-তৃতীয়াংশই এশিয়ার। দুই মহাদেশই যে পশ্চিম এশিয়ার তেলের ওপর কতটা নির্ভরশীল, তা এতে বোঝা যাচ্ছে।
গত বছরের অক্টোবরে কয়েকশ কোম্পানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৫ সালে আরোপ করা শুল্কে সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতির কথা জানিয়েছিল। ইরান যুদ্ধে ক্ষতি এরই মধ্যে তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এ যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে এয়ারলাইন্সগুলো। উড়োজাহাজের জ্বালানির দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় তারা এরই মধ্যে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলার লোকসানের মুখে পড়ার কথা জানিয়েছে। যুদ্ধের কারণে ৪৩০ কোটি ডলার ক্ষতি হতে পারে বলে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে টয়োটা। পিঅ্যান্ডজি অনুমান করছে, তাদের আয় কমবে ১০০ কোটি ডলার। সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ব্যাঘাতে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বাড়বে বলে আশঙ্কা করছে ফাস্টফুড চেইন ম্যাকডোনাল্ড’স। ‘যেটা আমরা এখন দেখছি, জ্বালানির বাড়তি দামই মূল সমস্যা,’ বলেছেন ম্যাকডোনাল্ডসের প্রধান নির্বাহী ক্রিস কেম্পজিনস্কি।
যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও উপকরণ নির্মাতা প্রায় ৪০টি কোম্পানি এরই মধ্যে জ্বালানির বাড়তি মূল্যের কারণে পণ্যের দাম বাড়াতে হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানি নিউয়েল ব্র্যান্ডসের প্রধান আার্থিক কর্মকর্তা বলেছেন, ব্যারেলপ্রতি ৫ ডলার করে তেলের দাম বাড়লে তাদের বাড়তি ৫০ লাখ ডলার করে লোকসান হচ্ছে।



