হরমুজ ও পারমাণবিক ইস্যুতে অচলাবস্থা, তবু আশার আলো

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
  • আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
  • ইরানের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন পাকিস্তান সেনাপ্রধান

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের দ্বাদশ সপ্তাহে এসেও স্থায়ী শান্তি চুক্তি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও কূটনৈতিক তৎপরতায় নতুন গতি এসেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ‘সামান্য অগ্রগতি’র কথা স্বীকার করেছেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন এবং একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির খসড়াও প্রকাশ পেয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের পারমাণবিক ইউরেনিয়াম মজুদ নিয়ে দুই পক্ষের মতভেদ এখনো প্রকট। বৈশ্বিক তেলবাজার অস্থির, আর বিশ্ব তাকিয়ে আছে - সামনের কয়েকটি দিন কোন দিক নেয়।

ছয় সপ্তাহ আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাতের স্থায়ী সমাধান এখনো অনিশ্চিত। গতকাল শুক্রবার সুইডেনের হেলসিনবর্গে ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘কিছুটা সামান্য অগ্রগতি হয়েছে। আমি এটি বাড়িয়ে বলতে চাই না, তবে একটু নড়াচড়া হয়েছে - এটা ভালো।’ একই সাথে তিনি সতর্ক করেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালীতে টোল আরোপ অব্যাহত রাখে, তাহলে কোনো সমাধানই সম্ভব নয়।

রুবিওর এই মন্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘গুরুতর আলোচনা’ চলার কথা জানিয়ে ইরানে সামরিক হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছেন। তবে ট্রাম্প আগেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, আলোচনা চুক্তির দিকে না গড়ালে যুক্তরাষ্ট্র ফের ইরানে হামলা চালাবে।

পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতা

এই সঙ্কট সমাধানে পাকিস্তান এখন সবচেয়ে সক্রিয় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায়। সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরানের উদ্দেশ্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো ইরান সফর করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চার দিনের উপসাগরীয় সফরে সৌদি আরবে রয়েছেন। নাকভির সাথে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির বৈঠকে যুদ্ধ শেষের শর্ত ও রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে ইরানি বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে।

আলজাজিরার সংবাদদাতা ইসলামাবাদ থেকে জানান, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা চাইছেন উভয় পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে বসাতে এবং যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরো বাড়াতে। প্রধানমন্ত্রী শরিফ আঞ্চলিক অংশীদারদেরও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে চাইছেন।

এর আগে ১১-১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সরাসরি আলোচনা হয়েছিল। সেই আলোচনায় যুদ্ধের অবসান, হরমুজ প্রণালী আবার চালু করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো নিয়ে কথা হলেও কোনো চুক্তি হয়নি।

শান্তিচুক্তির খসড়া প্রকাশ

এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার পাকিস্তানি নীতিবিশেষজ্ঞ আলী কে চিশতি একটি সম্ভাব্য শান্তি ও উত্তেজনা হ্রাস চুক্তির খসড়া প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, পাকিস্তানের উদ্যোগে প্রস্তুত এই খসড়ায় স্থল, সমুদ্র ও আকাশে তাৎক্ষণিক এবং শর্তহীন যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে। এতে সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা না করা, পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা, হরমুজ প্রণালীতে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করা এবং চুক্তি কার্যকরের সাত দিনের মধ্যে অমীমাংসিত ইস্যুতে আলোচনা শুরুর প্রস্তাব রয়েছে। খসড়ায় আরো উল্লেখ রয়েছে, ইরানের পূর্ণ সম্মতির বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে পারে।

হরমুজ ও পারমাণবিক ইস্যু : মূল বাধা

শান্তি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে এবং এখন জাহাজ চলাচলে টোল আরোপ করছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালী দিয়ে যায়। এর বন্ধ থাকায় জ্বালানি, সার ও খাদ্যপণ্যের সরবরাহে মারাত্মক বিঘœ ঘটছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ‘এটি আন্তর্জাতিক নৌপথ। কোনো টোল চাই না, এটাকে অবাধ ও উন্মুক্ত দেখতে চাই।’ একই সাথে ইরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা এটা পাবোই। প্রয়োজনে পাওয়ার পর ধ্বংস করে দেবো, কিন্তু কোনোভাবেই তাদের কাছে রাখতে দেবো না।’

ইরানের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতুবা খামেনির ফতোয়া জারি করা হয়েছে- ইরানের ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই দেশের বাইরে পাঠানো যাবে না।

অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

এই যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ভয়াবহ ধাক্কা দিয়েছে। তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। গতকাল শুক্রবার মার্কিন ডলার ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিনিয়োগ সংস্থা আইজির বাজার বিশ্লেষক টনি সাইকামোর মন্তব্য করেছেন, ‘বারো সপ্তাহ শেষে এসেও আমরা মার্কিন-ইরান সমস্যার সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছেছি বলে মনে হচ্ছে না।’

ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চাপও কম নয়। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি তার জনসমর্থন হোয়াইট হাউজে ফেরার পর সর্বনিম্নের কাছে নামিয়ে এনেছে। ইরানের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ক্ষতিপূরণকেই সঙ্ঘাত শেষের ‘একমাত্র পথ’ বলে দাবি করেছেন। এক ইরানি কর্মকর্তার হিসাবে ইরানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষয়ক্ষতি ইতোমধ্যে ২৭০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

আমিরাতের সতর্কবার্তা

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীর মর্যাদা পরিবর্তনে ইরানের যেকোনো পদক্ষেপ ইউরোপসহ বিশ্বব্যাপী মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। তার মতে, চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা এখন ‘ফিফটি-ফিফটি।’ তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘ইরানি কর্মকর্তারা বছরের পর বছর সুযোগ হাতছাড়া করেছেন। আশা করি এবার করবেন না।’

যুদ্ধে ইরানে নিহতের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। লেবাননেও সঙ্ঘাত থামেনি- গতকাল শুক্রবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি হামলায় চার প্যারামেডিকসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। শান্তির পথ এখনো দীর্ঘ, কিন্তু থেমে নেই কূটনীতির চাকা।